মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় ২০২৬ সালে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। ২০০৮ থেকে ২০২৬ সালের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সবচেয়ে কম। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।
শুধু পাসের হার নয়, এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ এবার জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬টি।
২০০৮ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ। ২০০৯ সালে তা কমে ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশে নেমে আসে। এরপর ধারাবাহিকভাবে পাসের হার বাড়তে থাকে এবং ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশে পৌঁছায়।
২০১৫ সালে পাসের হার কমে ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ হয়। ২০১৬ সালে তা বেড়ে ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও ২০১৭ সালে আবার কমে ৮১ দশমিক ২১ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৮ সালে পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা বেড়ে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৮৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়।
করোনাভাইরাস মহামারির বিশেষ পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে ফল প্রকাশের কারণে পাসের হার বেড়ে ৯৪ দশমিক ৮৭ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর আবার ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা এক ধাক্কায় কমে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে।
চলতি বছর পাসের হার আরও কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে। ২০১৪ সালের সর্বোচ্চ পাসের হারের তুলনায় এবার হার কমেছে ৩০ দশমিক ৪২ শতাংশ। এর আগে ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
২০২৬ সালে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর গড় পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। অন্যদিকে দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের পাসের হার ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম।
দাখিল পরীক্ষায় ছাত্রদের পাসের হার ৫১ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৫৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি।
বিষয়ভিত্তিক ফলাফলেও কিছু বোর্ডে দুর্বল চিত্র দেখা গেছে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং সাধারণ গণিতে ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। যশোর বোর্ডে বাংলায় পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ।
তবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে প্রায় সব বোর্ডেই পাসের হার ৯৮ থেকে ১০০ শতাংশের কাছাকাছি।
এদিকে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৬ সালে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ১৭৮টি।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারের ফলাফলকে শুধু ‘বিপর্যয়’ হিসেবে দেখলে প্রকৃত কারণগুলো আড়ালে থেকে যাবে। করোনাকালীন শিখন ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব, গত দুই বছরে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন এবং দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট—এসব কারণে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, করোনা-পরবর্তী শিখন ঘাটতি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যায়নি। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের সুফল না পাওয়া, গত দুই বছরের অস্থিরতা এবং গ্রামাঞ্চলে দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হকের মতে, করোনাকালে যারা ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছিল, তারা মাধ্যমিকে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতার প্রভাবও পড়াশোনায় পড়েছে। এ বছর খাতা মূল্যায়নেও তুলনামূলক কঠোরতা ছিল বলে তিনি মনে করেন।
ঢাকার কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ বলেন, এবার পরীক্ষা ও খাতা মূল্যায়ন ব্যবস্থা আগের তুলনায় কঠোর হয়েছে। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, শিক্ষক লাঞ্ছনা, প্রশাসনিক সংকট এবং শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কারণেও শিক্ষার্থীদের পাঠভিত্তি যথেষ্ট শক্ত হয়নি।
এদিকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক বলেন, “মন খুলে গান গাওয়া যায়, কিন্তু পরীক্ষায় নম্বর দেওয়া যায় না।”
তিনি বলেন, পরীক্ষার্থীরা যে নম্বর পাওয়ার যোগ্য, তাদের ঠিক সেই নম্বরই দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো কৃত্রিম অতিমূল্যায়ন করা হয়নি।
শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেশি ছিল। সে সময় বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করা হয়েছিল। এবারও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।