
ভারতে যখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা চলছে তখন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুনভাবে ‘রিঅ্যালাইন’ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না, তবে বন্ধু পরিবর্তন করা যায়। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে; তবে তা হতে হবে দুই দেশের স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে।’
দ্বিতীয়ত, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। মূলত মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণেই এই চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি। এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আছে। তাই এই চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তির খসড়া তৈরি করে দুই দেশ, যেখানে শুকনো মওসুমে ভারতের ৩৭.৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ৪২.৫ শতাংশ পানি পাওয়ার কথা হয়। কিন্তু রাজ্যের নিজস্ব পানির চাহিদা দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই চুক্তির বিরোধিতা করেন। এখন এই চুক্তি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, তিস্তা নদীর পানি নিয়ে যেকোন ধরনের সমঝোতা বাংলাদেশকে ভারতের সাথেই করতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার নামে এমন কিছু করা সঠিক হবে না যাতে দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাস এবং তিক্ততা তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, ভারতের গজলডোবায় নির্মিত ব্যারাজের কারণে তিস্তার পানিপ্রবাহ কী মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে তার একটা ধারণা পাওয়া যায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের তথ্য থেকে। উজানে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহের সব বাধা অপসারণ না করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা নদী মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করে তিস্তার পানি সংকটের সমস্যার কোনো সমাধান আদৌ সম্ভব নয়। চীনের তৈরি প্রকল্প পরিকল্পনা অনুসারে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে তিস্তা নদী খনন করে ও দুই পাশে বাঁধ দিয়ে নদীর প্রশস্ততা হ্রাস ও গভীরতা বৃদ্ধি, ড্রেজিংয়ের মাটি দিয়ে ভরাট করে নদীর দুই পাড়ে ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি উদ্ধার এবং সেই ভূমিতে আবাসন, শিল্প পার্কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে তিস্তা নদীর সর্বোচ্চ প্রস্থ ৫ দশমিক ১ কিমি এবং গড় প্রস্থ ৩ দশমিক ১ কিমি। দুই পাশে বাঁধ দিয়ে নদীর এ প্রস্থ কমিয়ে দশমিক ৭ কিমি থেকে ১ কিমির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হলে তা নদীর গতি ও পানি ধারণক্ষমতার ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এরমধ্যে পদ্মা এবং কুশিয়ারা ছাড়া আর কোন নদীর পানি বণ্টনের চুক্তি নেই। তাই আমাদের আলাপ আলোচনার মাধ্যমে পানি বণ্টন সমস্যার সম্মানজনক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে ভারতকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে।
ষষ্ঠত, ২৪ এর আগস্টের পর দুই দেশের অভ্যন্তরে অন্য দেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বেড়েছে। যেমন ভারতে বসে কেউ কেউ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার করছে, একটি নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। ঠিক তেমনি, বাংলাদেশের ভেতরও ভারত বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। তাই যে কোনো দায়িত্বহীন উস্কানি- দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো দেশের ভূখণ্ডই প্রতিবেশীর শান্তি-নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার জন্য হুমকি হতে পারে না। দুই দেশকেই অঙ্গীকার করতে হবে যে, তাদের মাটি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভয়ারণ্য হবে না।
সপ্তমত, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো যেমন পারস্পরিক স্বার্থে অথনৈতিক সহযোগিতা করে তেমনি বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য সহজীকরণসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত বাংলাদেশের জন্য বন্দর ব্যবহারসহ বেশ কিছু বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাংলাদেশে এখন জনগণের ভোটে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের উচিত একতরফাভাবে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।
বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারতের আগ্রহ আছে- এনিয়ে কোন সন্দেহ নেই। ভারত একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। মন্ত্রীর মর্যাদা প্রাপ্ত এই রাষ্ট্রদূত আলাপ আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার কথা বারবার বলছেন। বাংলাদেশও ইউনূস সরকারের একগুঁয়েমির কূটনীতির বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ ফাস্ট কূটনৈতিক দর্শন নিয়ে ভারতের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুত। ভারত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দুই দেশ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুন্দর হলে তা দুই প্রতিবেশী দেশের জন্যই ভালো। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রতিবেশীর সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কের বিকল্প নেই। আর এজন্য দুপক্ষকেই আন্তরিক হতে হবে। পরস্পরের প্রতি সম্মান, মর্যাদা এবং বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমেই হতে পারে সম্পর্কের নব যাত্রার সূচনা।