
শিক্ষা জীবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলার শুরু ছাত্রজীবনে। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বেও ছিলেন মির্জা ফখরুল। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাকে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছিল।
শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
বিএনপিতে যোগদান
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি দলের জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসেন।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এর আগে ও পরে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মূলধারার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাধিকবার জয়লাভ করেছেন। তিনি ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর পরবর্তী সময়েও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৬ এর নির্বাচনেও বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বর্ষীয়ান এই নেতা।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
বিএনপির মহাসচিব
২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। প্রায় পাঁচ বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর থেকে দলটির শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে রয়েছেন।
খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থানের সময়ে দেশে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল।
আন্দোলন ও কারাবরণ
বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের সময় একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেছেন মির্জা ফখরুল। ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজনৈতিক জীবনে সব মিলিয়ে তিনি প্রায় সাড়ে ৪০০ দিন কারাবরণ করেছেন বলে জানা যায়।
মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে মাঠের রাজনীতি থেকে দলীয় নেতৃত্ব, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। তার এই রাজনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
মির্জা ফখরুলের পারিবারিক জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম পারিবারিক জীবনকেন্দ্রিক এক ব্যক্তি। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই কন্যা মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তার পরিবার। তার স্ত্রী বেসরকারি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বর্তমানে তিনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তার বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এবং সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
ছাত্রনেতা ও শিক্ষক থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর এই মনোনয়ন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।