
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সোলাইমান ও সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আবদুল আলিমের বিরুদ্ধে তল্লাশির নামে এক টেম্পোচালককে জিম্মি করে ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে থানার এক কুখ্যাত সোর্সের পেতে দেওয়া ‘ফিটিংস কেসে’ (সাজানো নাটক) চালককে মাদক কারবারি বানিয়ে এই অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী চালক মো. কোরবান আলী ও তার সহকারী কাউসারের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
যেভাবে সাজানো হয় নাটকের দৃশ্যপট:
ঘটনার সূত্রপাত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। রাঙামাটির ঘাগড়া এলাকা থেকে কাঁচা বাজার, কলা ও জাম্বুরা ভর্তি একটি টেম্পো নিয়ে চালক কোরবান আলী আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানাধীন রাস্তার মাথা নাজুরঘাট এলাকায় পৌঁছান। এ সময় চান্দগাঁও থানার এসআই সোলাইমান ও এএসআই আবদুল আলিম তাদের গাড়িটিকে থামানোর সংকেত দেন।
গাড়ি থামানোর পর চালক ও হেলপারকে আটক করে পুলিশ দাবি করে, তাদের গাড়িতে দুই ‘টাইগার’ বোতল পাহাড়ি মদ (আড়াই শ’ মিলি ) রয়েছে। পুলিশ গাড়ি তল্লাশি শুরু করলে সাথে থাকা থানার সোর্স হেলাল নিজেই এগিয়ে যান। সোর্স হেলাল পূর্বে থেকেই নির্দিষ্ট করে দেখানো স্থান থেকে দুই বোতল পাহাড়ি মদ উদ্ধার করেন।
ব্যক্তিগত আক্রোশ ও সোর্সের সিন্ডিকেট :
ভুক্তভোগী চালক কোরবানের অভিযোগ, সোর্স হেলাল পূর্বপরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। ঘাগড়া এলাকায় স্থানীয় এক চালকের সাথে কোরবান আলীর বিরোধ হয়েছিল। সেই প্রতিপক্ষ পক্ষটি পরে সোর্স হেলালের শরণাপন্ন হয়। হেলাল তার পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী কোরবান আলীর টেম্পোটি (চট্টমেট্রো-দ-০৫-০০৬৩) টার্গেট করে আগেই নম্বরটি সংগ্রহ করে রাখেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চান্দগাঁও থানার সোর্স হেলালকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রের মূল কাজ হলো— ব্যক্তিগত আক্রোশ বা শত্রুতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের টার্গেট করে নিজেরা গোপনে গাড়িতে মাদকদ্রব্য রেখে দেওয়া এবং পরবর্তীতে পুলিশের সহযোগিতায় তল্লাশির নাটক সাজিয়ে চালক বা মালিকদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা।
তিন ঘণ্টা ঘুরিয়ে দরকষাকষি ও টাকা আদায় সোর্সের পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী চান্দগাঁও থানার এসআই সোলাইমান ও এএসআই আবদুল আলিম কোরবানের গাড়িটি আটকে রাখেন। এরপর মামলা ও জেলের ভয় দেখিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাদের থানা এলাকার আশপাশে বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়।
অসহায় চালক কোরবান বারবার আকুতি জানিয়েও কোনো কাজ না হলে বাধ্য হয়ে দরকষাকষি শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকায় বিষয়টি দফারফা করতে রাজি হয় পুলিশ। এর মধ্যে নগদ ৭ হাজার টাকা এবং সোর্স হেলালের ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে আরও ৮ হাজার টাকা পাঠানোর পর পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়।
পুলিশের বক্তব্য ও ম্যানেজের চেষ্টা এ ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে অভিযুক্ত এসআই সোলাইমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে এএসআই আবদুল আলিমের কাছে পুরো বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি চালককে আটকের কথা স্বীকার করে বলেন, “গাড়িটি আটক করেছিলাম, পরে ছেড়ে দিয়েছি। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে এটি একটি ‘ফিটিংস কেস’ (সাজানো ঘটনা)।”
টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সমস্ত দায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসআই সোলাইমানের ওপর চাপিয়ে দেন। এএসআই আলিম দাবি করেন, টাকা তিনি বা পুলিশ সরাসরি নেননি, সোর্স নিয়েছে। এ সময় সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিবেদককে চালকের টাকা ফেরত দেওয়ারও প্রস্তাব দেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চান্দগাঁও থানার একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও পরিবহন চালকদের এভাবে হয়রানি করে আসছে। অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত পুলিশ সদস্য ও সোর্সের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী চালকরা।