বিজ্ঞান মানুষকে অনেক কিছু উপহার দিয়েছে, যা মানুষের জীবনকে করেছে সহজতর। বিজ্ঞানের সেই উপহারের কোনো কোনোটা মানুষের বিবেচনাবোধের অভাবে রূপ নিয়েছে অভিশাপে। দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্লাস্টিক তার সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ। অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং বহনযোগ্য হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
প্লাস্টিক আমাদের জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। খাবার থেকে শুরু করে ওষুধ, প্রসাধনী, প্রযুক্তি, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য, সবক্ষেত্রেই বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ব্যবহার করছে প্লাস্টিক। মানুষের জীবনের সঙ্গে যেমন মিশে আছে প্লাস্টিক তেমনি এর অপব্যবহারে- সমুদ্র, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, প্রকৃতি দূষণের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই পলিমার। বলা যায় এটি এখন প্রকৃতির ক্যান্সারে রুপ নিয়েছে। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ফেললে আরও বিপদ।
প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারের পর বিশেষ করে পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিকের বোতল, গৃহস্থালির প্লাস্টিক কিংবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহূত প্লাস্টিক অধিকাংশই পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন না করে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে—যা পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত।
প্লাস্টিক এমন এক রাসায়নিক পদার্থ যা পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে কিংবা কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করতে অনেক সময় লাগে। তাই একে ‘অপচ্য পদার্থ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এগুলো পরিবেশে বর্জ্য আকারে জমা হতে থাকে এবং নিয়মিত প্লাস্টিক পদার্থের ব্যবহার দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়। হিসেব মতে, পরিবেশ থেকে মাত্র ৯ শতাংশ প্লাস্টিক পুনঃচক্রায়ন করা সম্ভব, যা পরিমাণে খুবই নগণ্য।
পরিবেশের ওপর মারাত্নক প্রভাব ফেলে প্লাস্টিক। সাধারণত উদ্ভিদ, জলজ প্রাণী, দ্বীপ অঞ্চলের প্রাণীরা প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এসব প্রাণীর বাসস্থান, খাবার সংগ্রহের স্থান এবং উদ্ভিদের খাবার গ্রহণের পথে বাধার সৃষ্টি করে প্লাস্টিক বর্জ্য। প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণেই মাটির জৈব উপাদানের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে এবং স্বাভাবিক পুষ্টি উপাদান উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে জলজ পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী খাবার হিসেবে ভয়ানক প্লাস্টিক গ্রহণ করছে, যার ফলে জলজ বাস্তুসংস্থানের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষও। গবেষণায় দেখা গেছে, থাইরয়েডের হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণের জন্য এই প্লাস্টিক দূষণ বিশেষভাবে দায়ী।
পুনর্ব্যবহার কেবল পরিবেশেরই উপকার করে না, অর্থনীতি ও সামজিক অবস্থার ওপরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বলা হয়ে থাকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ সকল রোগের আধার। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকলে মানুষের রোগ-বালাই হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। পুনর্ব্যবহার অন্যান্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চেয়ে অত্যন্ত টেকসই বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে যা মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ রোধে অনেকাংশে ভূমিকা রাখে। তাই প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং সাধারণ মানুষ যেন এ ব্যাপারে এগিয়ে আসে সেজন্য নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক থেকে রক্ষা পেতে পুনর্ব্যবহার আবশ্যক। তাহলেই নিশ্চিত হবে টেকসই উন্নয়ন।
হ্যাঁ, প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। এটি রিসাইক্লিং, ইনসিনারেশন, এবং অন্যান্য পদ্ধতির মাধ্যমে করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিগুলো প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ কমাতে, পরিবেশ দূষণ কমাতে এবং মূল্যবান সম্পদ তৈরি করতে সাহায্য করে।
প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের কয়েকটি উপায় হলো:
১. রিসাইক্লিং:
প্লাস্টিক রিসাইক্লিং হল প্লাস্টিক বর্জ্যকে নতুন প্লাস্টিক পণ্য বা অন্যান্য সামগ্রীতে প্রক্রিয়াকরণ করা।
এটি ল্যান্ডফিল্ডের উপর নির্ভরতা কমাতে, সম্পদ সংরক্ষণ করতে এবং পরিবেশ দূষণ কমাতে সাহায্য করে।
বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক রিসাইকেল করা যায়, যেমন: পিইটি (প্যাকেট), এইচডিপিই (বোতল), পিপি (পাত্র) ইত্যাদি।
রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ফাইবার, প্লেট, পাইপ, এবং অন্যান্য দরকারী পণ্য তৈরি করা যেতে পারে।
২. পাইরোলাইসিস:
পাইরোলাইসিস হল একটি প্রক্রিয়া যেখানে প্লাস্টিক বর্জ্যকে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক বর্জ্য তেল, গ্যাস, এবং কার্বনে রূপান্তরিত হয়।
এই তেল এবং গ্যাস জ্বালানি বা রাসায়নিক কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. ডিপলিমারাইজেশন:
ডিপলিমারাইজেশন হল প্লাস্টিক বর্জ্যকে তাদের মূল মনোমারে ভেঙে ফেলার একটি প্রক্রিয়া।
এই মনোমারগুলি নতুন প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. অন্যান্য পদ্ধতি:
প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরি করা যেতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে, প্লাস্টিক বর্জ্যকে নির্মাণ সামগ্রী, যেমন ইট বা রাস্তা তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্লাস্টিক বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার করে নতুন পণ্য তৈরি করা যেতে পারে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আয়ের একটি মাধ্যম হতে পারে।
প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা পরিবেশ এবং অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সঠিক পদ্ধতি এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে, আমরা প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যা মোকাবেলা করতে পারি এবং একই সাথে মূল্যবান সম্পদ তৈরি করতে পারি।