দেশে পর্যাপ্ত লবণ মজুদ ও উৎপাদন সত্ত্বেও এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে লবণ অঞ্চল খ্যাত কক্সবাজারের মহেশখালী। রবিবার সকাল থেকে শত শত লবণ চাষি, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষ উপজেলা চত্বরে জমায়েত হয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন, সরকারের এই "আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত" অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবিতে।
লবণচাষি, শ্রমিক ও ছাত্রসমাজের ব্যানারে আয়োজিত এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদীয় প্রার্থী ও নেতৃবৃন্দ সংহতি প্রকাশ করেন। বক্তারা একযুদ্ধে বলেন, এই সিদ্ধান্ত দেশীয় লবণ শিল্পের জন্য সরাসরি ধ্বংসাত্মক হুমকি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকার ওপর কুঠারাঘাত।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল শুক্কুর সিআইপি, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা জিয়াউল হক সহ অনেকে। সমাবেশে শিক্ষক, সাংবাদিক ও ছাত্রনেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
হাফেজ আবদু রহিমের কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সমাবেশে বক্তারা একটি মতেই সোচ্চার হন: "লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।"
সকাল থেকেই মহেশখালী ও পার্শ্ববর্তী লবণ ক্ষেত্রের চাষি ও শ্রমিকরা ব্যানার-ফেস্টুন হাতে উপজেলা চত্বরে সমবেত হন। তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল "দেশীয় লবণ শিল্প হত্যা বন্ধ করো", "লবণ আমদানি বাতিল কর", "চাষির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত কর"।
স্থানীয় চাষি নেচার আহমদের কথায় ধ্বনিত হয় সাধারণ মানুষের হতাশা: "মাঠে লবণের মজুত পড়ে আছে, নতুন মৌসুমের উৎপাদনও শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশি লবণ এলে আমাদের লবণের দাম তলানিতে চলে যাবে। আমরা কী খেয়ে বাঁচব?"
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৩১টি প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ৪২৯.১৮ মেট্রিক টন করে অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে, যা পরিশোধন করে বাজারজাত করতে হবে। দাপ্তরিক যুক্তি হল, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিকের সুপারিশেই এ সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিক্ষোভকারী চাষি, মিল মালিক ও স্থানীয় নেতারা এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের অভিযোগ, "বিসিক ভুল তথ্য দিয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার প্ররোচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।" তারা দাবি করেন, গত বছরের লবণ এখনও মাঠে ও গুদামে মজুত আছে এবং চলতি মৌসুমের উৎপাদনও আশাব্যঞ্জক। এই পরিস্থিতিতে আমদানি চাষিদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বিক্ষোভকারীরা লবণ আমদানি অবিলম্বে স্থগিত, দেশীয় উৎপাদকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান এবং সরকারি পর্যায়ে কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।
স্থানীয় নেতারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আবহাওয়াজনিত চাপ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মধ্যেই চাষিরা সংকটে রয়েছেন। যদি সরকার সময়মতো নীতিগত সুরক্ষা ও বাজার ব্যবস্থাপনা না করে, তবে দেশের লবণ শিল্প সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের মুখোমুখি হবে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে।
মহেশখালীর লবণ মজুদ গুদাম ও চাষের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, চাষিদের মুখে স্বাভাবিক উৎপাদনের উৎসাহের বদলে এখন শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়