সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের নেপথ্যে এক ভয়ংকর মাফিয়া চক্রের নাম উঠে এসেছে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন দুবাই প্রবাসী আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালানকারী ও হুন্ডি ব্যবসায়ী আলম ওরফে ‘সোনা আলম’। স্থানীয়দের কাছে ‘হুন্ডি আলম’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তি রাউজান যুবলীগের ক্যাডার এবং সাবেক বিতর্কিত সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও তাঁর ‘কিলিং মিশন’-এর অন্যতম অর্থ জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত।
মিতু হত্যাকাণ্ডের আসামিদের আশ্রয়দাতা ও নেপথ্য কারিগর
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ২০১৬ সালে দেশজুড়ে আলোচিত মিতু হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের একটি অংশকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিলেন এই সোনা আলম। চট্টগ্রামের কালামিয়া বাজারের পূর্ব পাশে একটি দোতলা বাড়িতে আসামিদের লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, সোনা আলমের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও বিপুল অর্থের প্রভাবে এই মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নেপথ্য নায়করা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুবাই ও ভারতের চোরাচালান নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তিনি ঘাতকদের আইনি জটিলতা থেকে বাঁচিয়ে রাখার কলকাঠি নাড়ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গড়ে তুলেছেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর বাকলিয়া, চকবাজার, কল্পলোক আবাসিক এলাকা, নোমান কলেজ সংলগ্ন বাস্তুহারা কলোনী, বায়েজিদ, রাউজান এবং বাঁশখালীতে সোনা আলমের রয়েছে এক বিশাল ভাড়াটে খুনি ও ক্যাডার বাহিনী। এই বাহিনী ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।
ছাত্র আন্দোলনে অর্থ ও মারণাস্ত্র সরবরাহ
গত জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সোনা আলম সিন্ডিকেট রাউজান ও চট্টগ্রাম শহরে ফজলে করিমের সন্ত্রাসী বাহিনীকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও মারণাস্ত্র সরবরাহ করেছিল। সরাসরি ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো যুবলীগ ক্যাডারদের পেছনে তিনি ‘লজিস্টিক সাপ্লায়ার’ হিসেবে কাজ করেছেন। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি কৌশল পরিবর্তন করে বর্তমানে ছদ্মবেশে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
অপরাধ সাম্রাজ্যের তিন স্তম্ভ
সোনা আলমের অপরাধলব্ধ আয়ের মূল খাতগুলো হলো:
আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালান: দুবাই-বাংলাদেশ রুটে স্বর্ণের অবৈধ চালান নিয়ন্ত্রণ।
হুন্ডি ও মানবপাচার: অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার এবং সাধারণ মানুষকে বিদেশে পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ।
সন্ত্রাসে অর্থায়ন: রাউজান ও চট্টগ্রামের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান।
প্রশাসনের ‘ছাতা’ ও আন্তর্জাতিক কানেকশন
অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় দশকে অর্জিত কালো টাকা দিয়ে প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন আলম। এমনকি বর্তমানে ভারতে পলাতক থাকা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের গোপন ‘কিলিং মিশন’ বাস্তবায়নে তিনি অন্যতম সমন্বয়ক বা ‘এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
জনমনে ক্ষোভ ও গ্রেপ্তারের দাবি
নতুন বাংলাদেশেও সোনা আলমের মতো ‘মাফিয়া’ কীভাবে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় বিচরণ করছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রামের সচেতন মহল, ভুক্তভোগী পরিবার এবং ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা অবিলম্বে এই আন্তর্জাতিক স্মাগলারকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সোনা আলমকে আইনের আওতায় আনলে মিতু হত্যাকাণ্ডের জট খোলার পাশাপাশি বিগত স্বৈরাচারী সরকারের অনেক গুপ্ত হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের সুপারিশ:
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবিলম্বে সোনা আলমের ব্যাংক হিসাব ও আন্তর্জাতিক লেনদেন খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সাথে এই ‘হুন্ডি আলম’ যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে, সেজন্য জরুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাঁকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।