শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, ‘শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণের টাকা পরিশোধের ব্যাপারে আমরা খুবই চিন্তিত ছিলাম। কারণ ২০২২ সাল থেকে যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁরা এখনো কোনো টাকা পাননি। শিক্ষকরা প্রতি মাসে নিজেরা চাঁদা দেন আর সরকার একটা অংশ দেয়।
কিন্তু গত ১৭ বছরে সেই জামানতের অনেক টাকাই বেহাত হয়েছে। আবার দুর্বল ব্যাংকেও অনেক টাকা আটকে রয়েছে। আমরা আগে থেকেই এই খাতে অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর চিন্তা-চেতনা বিশাল। শিক্ষকদের জন্য তাঁর ভালোবাসা অন্য যে কারো চেয়ে বেশি। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে তাঁদের অবসরের টাকা দিতে চান। এ জন্য আমাদের কাজ করার নির্দেশ দেন।’
আবদুল খালেক বলেন, ‘এরপর আমরা বিস্তারিত হিসাব করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাই। কিন্তু যে টাকা প্রয়োজন, তা হয়তো সরকারের পক্ষে একবারে দেওয়া দুঃসাধ্য। তাই একাধিক ধাপে অবসরের টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথম ধাপে শিক্ষকরা যে টাকা জমা রেখেছিলেন, তা পরিশোধে সম্মতি দেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য প্রয়োজন ছিল দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা। একবারে প্রধানমন্ত্রী দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। বাকি ১০০ কোটি টাকা অবসর-কল্যাণের ফান্ড থেকে নেওয়া হচ্ছে। ফলে ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী সবাই একবারে পাঁচ থেকে সাত লাখ পর্যন্ত টাকা পাবেন। আবার ছয় মাস পর বা তার আগেই দ্বিতীয় ধাপের টাকা পরিশোধ করা হবে।’
শিক্ষাসচিব বলেন, ‘এখন অবসর সুবিধা বোর্ডে আবেদন জমা আছে ৭৫ হাজার। আর কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন জমা ৪৪ হাজার। মোট এক লাখ ১৯ হাজার আবেদন জমা। কিন্তু যে শিক্ষক অবসরে আবেদন করেছেন, তাঁর কল্যাণেও আবেদন জমা আছে। ফলে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৭৫ হাজার। তাঁদের সবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আমাদের হাতে রয়েছে। সবাইকে আগামী ১৫ আগস্ট ইএফটির (ইলেকট্রনিকস ফান্ড ট্রান্সফার) মাধ্যমে একযোগে তাঁদের নিজ নিজ ব্যাংকে টাকা ট্রান্সফার করা হবে। এর আগে আগামী ১৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই মহানুভবতার জন্যই শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা সমাধানের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি আমরা।’
সূত্র জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতি মাসের মূল বেতন থেকে অবসর বোর্ডে কেটে নেওয়া হয় ৬ শতাংশ টাকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টে কেটে নেওয়া হয় ৪ শতাংশ টাকা। বেতন থেকে কেটে নেওয়া অর্থে পেনশনের পুরো টাকা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আগের সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ না দেওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদনের স্তূপ জমা রয়েছে। অবসর বোর্ডে দেওয়া ৬ শতাংশ অর্থে প্রতি মাসে জমা হয় ৭০ কোটি টাকা। আর বোর্ডের এফডিআর থেকে আসে তিন কোটি টাকা। প্রতি মাসে মোট আয় হয় ৭৩ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতি মাসে যত সংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে যান, তাঁদের পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে প্রয়োজন হয় ১১৫ কোটি টাকা। ফলে প্রতি মাসে ঘাটতি থাকে ৪২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে কল্যাণ ট্রাস্টে জমা দেওয়া ৪ শতাংশ অর্থে ফান্ডে প্রতি মাসে জমা হয় ৫০ কোটি টাকা। আর ট্রাস্টের এফডিআর থেকে মাসে পাওয়া যায় দুই কোটি টাকা। ফলে সব মিলিয়ে মাসে আয় হয় ৫২ কোটি টাকা। অথচ প্রতি মাসে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ৬৫ কোটি টাকা। এতে প্রতি মাসে ঘাটতি থেকে যায় ১৩ কোটি টাকা। এরপর আবার দুর্বল ব্যাংকে শিক্ষকরা এসব টাকা রাখার কারণে অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায় অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সব শিক্ষকের পাওনা একবারে পরিশোধ করতে সরকারের কাছ থেকে এককালীন সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ প্রয়োজন। কিন্তু অবহেলিত এসব শিক্ষকের পেনশনের টাকা পরিশোধ করতে আগের সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। এমপিওভুক্ত এসব শিক্ষকের দুর্দশা ঘোচাতে এবার বিএনপি সরকার বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করল।
শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দ্বিতীয় ধাপে আবার কবে টাকা দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে আমরা সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চাই। কারণ একবার একটা অংশ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের টাকা দেওয়া নিয়ে মন্ত্রণালয়ের অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে। যা আমাদের আশঙ্কার কারণ। আমরা চাই শুধু শিক্ষকদের দেওয়া অংশ নয়, সরকারের অংশসহ পুরো টাকাটাই শিক্ষকরা যেন পান। বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন কম। শেষ জীবনে তাঁদের এই টাকাই ভরসা। তাঁরা একবারে একটা বড় অঙ্কের টাকা পেলে তা কাজে লাগিয়ে অবসর জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবেন।’