প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ১২, ২০২৬, ৯:৩৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ৮, ২০২৬, ১২:১৯ পি.এম
আমাদের বুড়িগঙ্গা নদীটি

আমার ছেলেবেলার জীবনের কয়েকটি বছর কেটেছে পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার থার্ড লেনে। বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রাম আর জিন্দাবাহারের চিপা গলির ভেতরকার বাড়ি, এই দুই জায়গায় পড়ে আছে আমার অনেকখানি ছেলেবেলা।সাত-আট বছর বয়স হবে। আমাদের বেড়ানোর প্রধান জায়গা ছিল সদরঘাট। সেখানে তখনো লঞ্চ টার্মিনাল হয়নি। বাকল্যান্ড বাঁধের কোনো কোনো জায়গা কেটে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে।
সেই সিঁড়ি নেমে গেছে বুড়িগঙ্গা তীরের বালিয়াড়িতে। বিভিন্ন জেলার লঞ্চ এসে থামত তীরে। কী স্বচ্ছ পানি বুড়িগঙ্গার! তলার নুড়ি পাথরটিও দেখা যায়। শ্রমজীবী মানুষ নদীতে নেমে গোসল করত।কেউ কেউ সাঁতার কেটে নদী এপার ওপার করত। কত খেয়ানৌকা নদীতে। নৌকা থামার জায়গাটিকে বলা হতো ‘গুদারাঘাট’। বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়ালে হু হু করা হাওয়ায় ভেসে আসত নদীর পানির মন ভালো করা গন্ধ। কী বিস্তীর্ণ নদী বুড়িগঙ্গা! এই নদীর পানিও দুপাড়ের মানুষ তখন পান করত।
ঠিলা কলস ভরে ভরে পানি বয়ে নিতেন নারীরা। তখনো পানি ফুটিয়ে খাওয়ার কথা জানে না অনেকে। ঠিলা বা কলসিতে এক টুকরা ফিটকিরি ফেলে দিলে বুড়িগঙ্গার পানি হয়ে যেত সুস্বাদু ও উপাদেয়।
জিন্দাবাহারের জীবনে একবার বাড়ির সবাই মিলে মিরপুর মাজারে যাওয়ার পরিকল্পনা হলো। একষট্টি-বাষট্টি সালের কথা। ঢাকা থেকে মিরপুরে যাওয়ার তখন কোনো রাস্তা তৈরি হয়নি। মাটির কাঁচা পথে হেঁটে যাওয়া মুশকিল। বড় একটি নৌকা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বাদামতলী ঘাট থেকে নৌকায় চড়েছিলাম। বুড়িগঙ্গার পশ্চিমমুখী নৌকা চলছে। পশ্চিমে চলতে চলতে উত্তরে বাঁক নিয়েছিল একসময়। নদীর দুপাড়ে তখন একেবারেই গ্রামীণ দৃশ্য। গৃহস্থ নারী পুরুষের প্রতিদিনকার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা। নদীর দুতীর ঘেঁষেই ভেঁসাল পেতে মাছ ধরছেন জেলেরা। কত ডিঙিনৌকা আর মহাজনি নৌকা নদীতে। কোথায় হারিয়ে গেছে নদীটির সেই চেহারা!আমার কৈশোরকাল শুরু হয়েছিল পুরান ঢাকার আরেক প্রান্তে, গেণ্ডারিয়ায়। গেণ্ডারিয়া হাই স্কুল, ধূপখোলা মাঠ আর মিলব্যারাকের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা। মিলব্যারাক মাঠের পশ্চিম দিক আর ফরাশগঞ্জের পূর্ব দিক, তার মাঝখান দিয়ে উত্তরে ঢুকে গেছে ধোলাইখাল। সেই খালও এখনকার অনেক নদীর চেয়ে বিস্তৃত। খালের ওপর সূত্রাপুরের বিখ্যাত লোহারপুল, কলুটোলা আর ডিস্ট্রিলারি রোডের কাঠেরপুল। বর্ষায় মহাজনি নৌকা চলত ধোলাইখালে। দুপাড়ের মানুষজন খালের পানিতে ধোয়াপাকলার কাজ করত, গোসল করত। আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে কাঠেরপুলের ওপর থেকে কত কত দুপুরে খালের জলে লাফিয়ে পড়েছি। ডুবোডুবি আর সাঁতার কেটে দুপুরবেলা ফুরিয়ে ফেলেছি। সেই আনন্দের কাল অবিস্মরণীয় হয়ে আছে জীবনে। ধোলাইখালের বর্ষার পানিও খাওয়ার উপযোগী ছিল তখন। রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত তো হতোই।
সাতষট্টি-আটষট্টি সালের কথা। আমরা বন্ধুরা মিলে ছুটির দিনে মিলব্যারাকের পশ্চিম পাশে চলে যেতাম গোসল করতে। বর্ষাকাল। বুড়িগঙ্গার পানি বিপুল স্রোত নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে ধোলাইখালে। স্রোতের কলকল শব্দ হচ্ছে। আমরা গোসল করতে নেমেছি ওই দিকটাতেই। হঠাৎই আমাদের বন্ধু পান্নার আর্তচিৎকার। সাঁতার কাটতে থাকা আর পানিতে লাফঝাঁপ করতে থাকা বন্ধুরা উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়েছি। দেখি পান্না ভেসে যাচ্ছে স্রোতের টানে। ভালো সাঁতার জানে সে। তার পরও স্রোতের তোড়ে এগোতে পারছে না। এক মাঝি দ্রুত নৌকা নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন, পান্নাকে উদ্ধার করেছিলেন। এখন সেই ধোলাইখালটিই নেই। লোহারপুল কাঠেরপুল কোথায় হারিয়ে গেছে! ধোলাইখালের জায়গায় এখন পাকা রাস্তা।
গ্রীষ্মকালে সামান্য সরু হতো বুড়িগঙ্গা। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় আমরা কয়েক বন্ধু মিলে বাজি ধরে সাঁতার কেটে বুড়িগঙ্গা এপার ওপার করেছিলাম। সাঁতার কাটতে কাটতে কত পানি যে খেয়েছিলাম বুড়িগঙ্গার, তা বলা যাবে না। সাঁতার কাটতে গেলে পানি তো মুখে যাবেই। কোথায় হারিয়ে গেছে আমাদের সেই প্রিয় নদীটি! একদার স্বচ্ছতোয়া নদীটি এখন মৃতপ্রায়। ঢাকার মানুষ, আমরা নদীটি মেরে ফেলেছি। এখনো দেশের কোনো কোনো নদী বর্ষায় পাড় ভাঙে। মানুষের ঘরবাড়ি বিলীন হয়। নদীভাঙা মানুষ বলে, ‘নদী সব খেয়ে ফেলেছে।’ বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। মানুষই বুড়িগঙ্গা খেয়ে ফেলেছে। বুড়িগঙ্গার মতো দেশের অনেক নদী খেয়ে ফেলেছে, মেরে ফেলেছে। গত চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরে ধীরে ধীরে, সূক্ষ্মভাবে বুড়িগঙ্গা কলুষিত হতে লাগল, পাড় দখল হতে লাগল। যে যেভাবে পারে নদীটি খেয়ে ফেলতে লাগল। এখন নদীটি ভয়াবহ রকমের অস্তিত্ব সংকটে। শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, দেশের বহু নদী এই সংকটে মরে গেছে। দখল হয়ে গেছে নদী।
বুড়িগঙ্গা দখল চলছে দীর্ঘদিন ধরে। দখল করে নানা ধরনের স্থাপনা তৈরি হয়েছে। কামরাঙ্গীর চর আর কেরানীগঞ্জ প্রান্তেও হয়েছে একই রকমের দখল। বিস্তীর্ণ নদীটি ধীরে ধীরে শীর্ণ হয়ে গেছে। এই দখলে বরাবরই যুক্ত থেকেছে সমাজের নানা ধরনের প্রভাবশালী মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ। নদী দখল করে বসতবাড়ি করা হয়েছে। দোকানপাট মিলকারখানা করা হয়েছে। রেস্টুরেন্ট করা হয়েছে। নদীর অনেকখানি ভেতর পর্যন্ত প্রথমে তৈরি করা হয়েছে মাছের ঘের। তারপর ধীরে ধীরে বালু ফেলে ওই অংশটা ভরাট করা হয়েছে। যিনি ভরাট করেছেন তিনিই জমির মালিক। এইভাবে কোথাও তৈরি করা হয়েছে ডকইয়ার্ড, বালুর গদি।
Copyright © 2026 Newstoday24bd.com. All rights reserved.