
ভাষার ব্যবহার নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের জানতে হবে ভাষা কি ?. – ভাষা হচ্ছে, মনের ভাব প্রকাশক বাক্যের সমষ্টিকে ভাষা বলে।
ব্যাকরণগত দিক থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মানুষ তার মনের ভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করার জন্য কন্ঠধ্বনি এবং হাত, পা, চোখ ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে ইঙ্গিত ব্যবহার করে থাকে। তবে কন্ঠের সাহায্যে একজন সুস্থ মানুষ তার মনের ভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে থাকে, যা ইশারা ঈঙ্গিতের মাধ্যমে সঠিক ভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কন্ঠধ্বনির সাহায্যে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে ; কন্ঠধ্বনি বলতে মুখ গহ্বর, কন্ঠ, নাসিকা ইত্যাদির সাহায্যে উচারিত বোধগম্য ধ্বনি বা ধ্বনির সমষ্টিকে বোঝায়। ধ্বনি হচ্ছে ভাষার মূল উপাদান, ধ্বনির মাধ্যেমেই ভাষার সৃষ্টি হয়, ধ্বনি সৃষ্টি হয় বাগযন্ত্রের দ্বারা। বাগযন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনিই মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে, যাকে আমরা ভাষা বলি।
দেশ, কাল, পরিবেশের উপর ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, ফলে অঞ্চল ভেদে ভাষার ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজার থকে পাঁচ হাজার প্রচলিত ভাষা রয়েছে, প্রত্যেক অঞ্চলে আবার নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষাও রয়েছে। মানুষ প্রথমে তার আঞ্চলিক ভাষা রপ্ত করে এবং আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, জনপদ অনুসারে বাক্যের গঠন আলাদা হয় এবং ভাষাও আলাদা হয়। পৃথিবীর প্রধান ভাষার মধ্যে রয়েছে- চীনা, ইংরেজী, হিন্দি, বাংলা, আরবি, রুশ, জার্মানি, ফরাসি, কোরিয়ান, উর্দু, স্পানিশ ইত্যাদি ভাষা। জনসংখ্যার হিসেবে বাংলা পৃথিবীর ৬ষ্ঠ তম বৃহত্তম ভাষার স্থান দখল করেছে এবং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। ১৯৬৯ সালে “গুপী গাইন বাঘা বাইন” ছবির গানে বাংলাদেশের কথা উঠে এসেছে, “মোরা বাংলাদেশ থেকে এলাম’’ বিখ্যাত চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায় তার ছবিতে এই গানটি পরিবেশন করেছেন।
বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের নাম অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত, বাংলা ভাষা সমৃদ্ধির পিছনে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলা ভাষা ভাষিদের জন্য পৃথক দেশের স্বপ্ন বোধ করি অনেকেই দেখেছে তা গানে ও কবিতাই ফুটে উঠেছে।
পৃথিবীর সব ভাষায় দুটি ধাঁরা বিদ্যমান, একটি কথ্য ভাষা ও অন্যটি লেখার ভাষা। বাংলা ভাষায় এক্ষেত্রে একাধিক রীতি প্রচলিত আছে। বর্তমানে আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি সাধু ও চলিত ভাষা বহুল প্রচলিত। সাধু ভাষা শুধু মাত্র দাপ্তরিক কাজ, সাহিত্য রচনা, যোগাযোগ ও জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনে প্রচলিত হলেও বর্তমানে চলিত ভাষার প্রচলন বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পাশাপাশি অন্য ভাষার শব্দ ও বাংলা ভাষায় যুক্ত হয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে, যেমন আরবি থেকে ধর্মীয় শব্দ- তসবি, জাকাত, হারাম, হালাল ইত্যাদ। অনান্য শব্দ যেমন- আদালত, কলম, উজির, ইদ, এজলাস ইত্যাদি।
ফারসি থেকে- নামায, ফেরেশতা, বেহেশত, রোজা, দোকান, দৌলত, মেথর, আমদানি, রপ্তানি ইত্যাদি।
ইংরেজী থেকে- ইউনিভার্সিটি, ইউনিয়ন, কলেজ, পেনসিল ইত্যাদি। এছাড়া পর্তুগীজ, ফরাসি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, তুর্কি, চীনা, বার্মিজ, জাপানি বিভিন্ন দেশের বা জনগোষ্ঠীর শব্দ বাংলা ভাষায় যুক্ত হয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে যা বর্তমানে বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে যুক্ত হয়েছে।
বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে আজ স্বীকৃত। বাংলাদেশ ছাড়া ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা সহ অন্যান্য প্রদেশেও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে। ধ্রুপদি ভাষা সংস্কৃত ও পালির সঙ্গে বাংলা ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। প্রত্যেক অঞ্চলের মানুষের কাছে তার আঞ্চলিক ভাষায় প্রথম মাতৃভাষা। এরপর কথ্য, লেখ্য ভাষা প্রধান মাতৃভাষা হিসেবে বিবেচিত। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত গান ও দোহা গ্রন্থে সংকলিত চব্বিশ জন পদকর্তা কর্তৃক রচিত পদাবলী। প্রচীন বাংলায় রচিত পদগুলি যেমন সাহিত্য মূল্য রয়েছে তেমনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে সমাদৃত। বাংলা ভাষায় ব্যবহারের উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে যুগে যুগে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, কলাকুশলী, নাট্য ব্যক্তিত্ব, নাট্য নির্মাতা, ধর্মীয় শিক্ষাগুরুরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তাদের হাত ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সৃজনশীল ভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে এবং বাংলা ভাষা এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের ভাষা হিসেবে গ্রোথিত হয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সৃজনশীল উৎকর্ষ সাধনে একজন প্রখ্যাত বাঙ্গালী লোক সাহিত্য গবেষক ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন কথ্যভাষা ও সাহিত্য রচনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এছাড়াও তিনি মৈয়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলা লোকসাহিত্য কে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আরেকজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদকে আদি বাংলা ভাষা হিসেবে প্রমাণ করেন এবং গৌরী বা মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে বলে মত দেন। তিনি বাংলা ভাষার ইতিহাস এবং আঞ্চলিক ভাষার উপর বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান রচনা করেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি ১৯৪৭ সালে আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে বাংলা কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ হল ডঃ আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ। তিনি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিদের প্রায় দুইহাজার এর বেশি মূল্যবান পুথি সংগ্রহ করেন। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদই প্রথম বলেন বাংলা বাঙালির জাতীয় ভাষা।
বাংলা ভাষার উৎকর্ষতা দীর্ঘ সময় ধরে স্বকীয় মহিমায় টিকেছিলো ভাষা আন্দোলনের পূর্বভাগ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় মাতৃভাষা বাংলাকে ঘিরে সংঘঠিত রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা বাংলাদেশের মানুষের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন চুড়ান্ত রূপ লাভ করে। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে সাল
কাজী ফারহান হায়দার 














