ঢাকা ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার: পদে পদে জালিয়াতি এশিয়ান গ্রুপের, শুল্ক ফাঁকি ৭৯২ কোটি টাকা

​সরকারি শুল্ক সুবিধার অপব্যবহার করে জাল ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) মাধ্যমে সরকারের ৭৯২ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে এশিয়ান গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেড। চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের এক বিশেষ নিরীক্ষায় (অডিট) রাজস্ব ফাঁকির এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

​নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতের এই প্রতিষ্ঠানটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় প্রায় ৩ কোটি ডলারের কাঁচামাল আমদানি করে তা খোলাবাজারে অবৈধভাবে বিক্রি বা অপসারণ করেছে। এ ছাড়া ব্যাক টু ব্যাক এলসির (ঋণপত্র) তথ্য গোপন করে বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার প্রমাণও মিলেছে।

​জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বন্ড জালিয়াতির এই ঘটনায় চার বছর আগে বিচারাদেশ (ডিমান্ড নোটিশ) জারি করা হলেও সরকারের পাওনা টাকা এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি।

​পোশাক খাতের রপ্তানি বাড়াতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে বন্ডেড ওয়ারহাউস বা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা দিয়ে আসছে। বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা জানান, চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলস এই সুবিধার অপব্যবহার করে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কাঁচামাল আমদানি করে। কিন্তু নিয়মানুযায়ী সেই অনুপাতে পণ্য রপ্তানি করেনি।

​সবচেয়ে বড় জালিয়াতি ধরা পড়েছে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর ইউডি (আমদানি ও ব্যবহারের ঘোষণাপত্র) ব্যবহারের ক্ষেত্রে। তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি যেসব ইউডির মাধ্যমে কাঁচামাল খালাস করেছে, বিজিএমইএর মূল সার্ভার বা ওয়েবসাইটে সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই।

​পরবর্তীতে জালিয়াতি ঢাকতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বন্ড কমিশনারেটে ইউডি সংশোধনের কিছু অনুলিপি জমা দেওয়া হয়। তবে বন্ড কর্মকর্তারা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, ওই সংশোধিত ইউডিগুলোও ভুয়া।

​আমদানি-রপ্তানির নথিপত্রে অমিল এবং পণ্য অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলার অভিযোগে চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে বন্ড কমিশনারেট পৃথক চারটি মামলা করেছে।
​রাজস্ব ফাঁকির মামলা ফিরে তোলপাড়!

​প্রাথমিক মামলা: বিশেষ নিরীক্ষায় প্রথম দফায় ৩২৭ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির মামলা করা হয়।
​দ্বিতীয় দফার মামলা, নথিপত্র অধিকতর যাচাইয়ের পর আরও ৩৭৯ কোটি টাকা ফাঁকির আরেকটি মামলা দায়ের হয়।
​স্থানীয় ভ্যাট ফাঁকির মামলা, ১২৯টি ব্যাক টু ব্যাক এলসির তথ্য ইউডিতে উল্লেখ না করায় ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং স্থানীয় পর্যায়ের অন্যান্য ভ্যাট বাবদ ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার পৃথক মামলা হয়।
​কাঁচামাল গায়েবের মামলা, ২০২০ সালে আমদানিকৃত ৬ কোটি ডলারের কাপড়ের (ফেব্রিক্স) মধ্যে ৫৭ লাখ ৯১ হাজার ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানির কোনো হদিস মেলেনি। এই খাতেই শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ৭৯ কোটি টাকা।

​এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের তৎকালীন কমিশনার এ কে এম মাহবুবুর রহমান বলেন, “এশিয়ান অ্যাপারেলসে বিশেষ নিরীক্ষা চালিয়ে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়। আইন অনুযায়ী বন্ড কমিশনারেট থেকে মামলা করা হয়েছে এবং ডিমান্ড নোটিশ জারি করা হয়েছে।”
​বন্ড কর্মকর্তারা জানান, মামলার শুনানিতে অংশ নিলেও আমদানিকৃত কাঁচামালের বিপরীতে পণ্য রপ্তানির কোনো বৈধ প্রমাণ বা সদুত্তর দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ।

​যোগাযোগ করা হলে চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুস সালাম এ বিষয়ে মন্তব্য না করে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাসিম আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। ​নাসিম আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “বন্ড কমিশনারেট যেসব মামলা করেছে, তা সঠিক নয়। এখানে ইউডি জালিয়াতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। বন্ডের এই দাবির বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে রিট করেছি। বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।”

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে চট্টগ্রাম বন্দরে ‘রেকর্ড’, দুই বছরে গতিশীলতায় নতুন উচ্চতা

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার: পদে পদে জালিয়াতি এশিয়ান গ্রুপের, শুল্ক ফাঁকি ৭৯২ কোটি টাকা

আপডেট সময় : ০৩:১৬:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

​সরকারি শুল্ক সুবিধার অপব্যবহার করে জাল ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) মাধ্যমে সরকারের ৭৯২ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে এশিয়ান গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেড। চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের এক বিশেষ নিরীক্ষায় (অডিট) রাজস্ব ফাঁকির এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

​নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতের এই প্রতিষ্ঠানটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় প্রায় ৩ কোটি ডলারের কাঁচামাল আমদানি করে তা খোলাবাজারে অবৈধভাবে বিক্রি বা অপসারণ করেছে। এ ছাড়া ব্যাক টু ব্যাক এলসির (ঋণপত্র) তথ্য গোপন করে বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার প্রমাণও মিলেছে।

​জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বন্ড জালিয়াতির এই ঘটনায় চার বছর আগে বিচারাদেশ (ডিমান্ড নোটিশ) জারি করা হলেও সরকারের পাওনা টাকা এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি।

​পোশাক খাতের রপ্তানি বাড়াতে সরকার দীর্ঘদিন ধরে বন্ডেড ওয়ারহাউস বা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা দিয়ে আসছে। বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা জানান, চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলস এই সুবিধার অপব্যবহার করে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কাঁচামাল আমদানি করে। কিন্তু নিয়মানুযায়ী সেই অনুপাতে পণ্য রপ্তানি করেনি।

​সবচেয়ে বড় জালিয়াতি ধরা পড়েছে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর ইউডি (আমদানি ও ব্যবহারের ঘোষণাপত্র) ব্যবহারের ক্ষেত্রে। তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি যেসব ইউডির মাধ্যমে কাঁচামাল খালাস করেছে, বিজিএমইএর মূল সার্ভার বা ওয়েবসাইটে সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই।

​পরবর্তীতে জালিয়াতি ঢাকতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বন্ড কমিশনারেটে ইউডি সংশোধনের কিছু অনুলিপি জমা দেওয়া হয়। তবে বন্ড কর্মকর্তারা বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, ওই সংশোধিত ইউডিগুলোও ভুয়া।

​আমদানি-রপ্তানির নথিপত্রে অমিল এবং পণ্য অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলার অভিযোগে চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে বন্ড কমিশনারেট পৃথক চারটি মামলা করেছে।
​রাজস্ব ফাঁকির মামলা ফিরে তোলপাড়!

​প্রাথমিক মামলা: বিশেষ নিরীক্ষায় প্রথম দফায় ৩২৭ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির মামলা করা হয়।
​দ্বিতীয় দফার মামলা, নথিপত্র অধিকতর যাচাইয়ের পর আরও ৩৭৯ কোটি টাকা ফাঁকির আরেকটি মামলা দায়ের হয়।
​স্থানীয় ভ্যাট ফাঁকির মামলা, ১২৯টি ব্যাক টু ব্যাক এলসির তথ্য ইউডিতে উল্লেখ না করায় ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং স্থানীয় পর্যায়ের অন্যান্য ভ্যাট বাবদ ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার পৃথক মামলা হয়।
​কাঁচামাল গায়েবের মামলা, ২০২০ সালে আমদানিকৃত ৬ কোটি ডলারের কাপড়ের (ফেব্রিক্স) মধ্যে ৫৭ লাখ ৯১ হাজার ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানির কোনো হদিস মেলেনি। এই খাতেই শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ৭৯ কোটি টাকা।

​এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের তৎকালীন কমিশনার এ কে এম মাহবুবুর রহমান বলেন, “এশিয়ান অ্যাপারেলসে বিশেষ নিরীক্ষা চালিয়ে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়। আইন অনুযায়ী বন্ড কমিশনারেট থেকে মামলা করা হয়েছে এবং ডিমান্ড নোটিশ জারি করা হয়েছে।”
​বন্ড কর্মকর্তারা জানান, মামলার শুনানিতে অংশ নিলেও আমদানিকৃত কাঁচামালের বিপরীতে পণ্য রপ্তানির কোনো বৈধ প্রমাণ বা সদুত্তর দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ।

​যোগাযোগ করা হলে চিটাগাং এশিয়ান অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুস সালাম এ বিষয়ে মন্তব্য না করে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাসিম আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। ​নাসিম আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “বন্ড কমিশনারেট যেসব মামলা করেছে, তা সঠিক নয়। এখানে ইউডি জালিয়াতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। বন্ডের এই দাবির বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে রিট করেছি। বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।”