
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পরিচ্ছন্নতা বিভাগের গাড়িচালক মো. শাহিন। পদবিতে ‘ছোট ময়লা পরিবহনকারী গাড়ির চালক’ হলেও তার জীবনযাপন ও সম্পদের বহর দেখে চেনার উপায় নেই যে তিনি মাত্র ১৩ হাজার ৫০০ টাকা বেতনের একজন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। ময়লার গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ১০ বছরে তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য।
চসিকের জ্বালানি তেল চুরি এবং অবৈধ ব্যবসার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে শাহিন এখন লাখ টাকার মোটরসাইকেল ও বিলাসবহুল প্রাইভেট কারের মালিক। একজন সাধারণ চালকের এমন ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার ঘটনায় খোদ সিটি করপোরেশনের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত প্রায় ১০ বছর ধরে চসিকের বাকলিয়া এলাকায় ময়লা পরিবহনের গাড়ি চালাচ্ছেন শাহিন। বর্তমানে তার মাসিক বেতন মাত্র ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার বিভিন্ন ছবি সূত্রে জানা গেছে, শাহিন যাতায়াত করেন লাখ টাকা মূল্যের একটি প্রাইভেট কারে। শুধু তাই নয়, তার সংগ্রহে রয়েছে লাখ টাকা দামের একটি দামি মোটরসাইকেলও।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, সিটি করপোরেশনের সর্বনিম্ন স্তরের চালক হয়েও তিনি নিজের ব্যক্তিগত প্রাইভেট কারে অবৈধভাবে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন’ এর লোগো ব্যবহার করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নগরী। এছাড়া নগরীর একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে বসবাসের পাশাপাশি তিনি গাড়ি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। যদিও আইনি জটিলতা এড়াতে ব্যবসার কাগজপত্র অন্যের নামে রাখা হয়েছে, তবে এর মূল নিয়ন্ত্রণ শাহিনের হাতেই বলে নিশ্চিত করেছে চসিকে একাধিক সূত্র।
শাহিনের এই উল্কাগতিতে ধনী হওয়ার পেছনে মূল উৎস চসিকের বরাদ্দকৃত ডিজেল ও অকটেন চুরি। জানা গেছে, প্রতিদিন চসিকের ময়লা পরিবহনের জন্য শাহিনের গাড়ি বাবদ ৬ থেকে ১২ লিটার জ্বালানি তেল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট ট্রিপ শেষে সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৮ লিটার তেল খরচ হয়। বাকি অতিরিক্ত তেল তিনি প্রতিদিন জমিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করে দেন।
শুধু তাই নয়, শাহিন নিজে নিয়মিত গাড়িও চালান না। চসিক থেকে গাড়ি ও তেলের স্লিপ সংগ্রহ করে তিনি টাকার বিনিময়ে অন্য দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক দিয়ে গাড়িটি চালান, আর নিজে ব্যস্ত থাকেন তেল চুরির সিন্ডিকেট ও ব্যক্তিগত ব্যবসা দেখভালে।
ভোক্তা পর্যায়ে যেখানে প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে খরচ হয় ১১৫ টাকা, সেখানে শাহিন সিন্ডিকেট তা বিক্রি করছে মাত্র ৯৫ টাকায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নগরীর নতুন ব্রিজ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি নির্দিষ্ট তেল ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে শাহিন নিয়মিত এই চুরির তেল বিক্রি করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহিনের কাছ থেকে তেল কেনা এক ক্রেতা বলেন, “আমি শাহিনের কাছ থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ৯৫ টাকায় কিনি। তিনি দীর্ঘ দিন ধরেই নিয়মিত এখানে তেল সরবরাহ করেন।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চসিকে চালক হিসেবে চাকরি পান শাহিন। চাকরিতে ঢুকেই সাবেক শাসকদলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় জড়ান তিনি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চসিকের পরিবহন বিভাগে গড়ে তোলেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অলৌকিকভাবে এখনো বহাল তবিয়তে নিজের রাজত্ব ধরে রেখেছেন শাহিন।
সম্পদের উৎস ও তেল চুরির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. শাহিন কৌশলী জবাব দেন। দামি প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল নিজের স্বীকার করে তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চালাই, এটা সত্যি। তবে চাকরির পাশাপাশি আমার নিজস্ব ব্যবসা আছে। এগুলো সেই ব্যবসার টাকায় কেনা।”
তবে একজন সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কীভাবে ব্যবসা করছেন, আর যদি লাভজনক ব্যবসাই থাকবে, তবে বছরের পর বছর কেন ১৩ হাজার টাকা বেতনের ময়লার গাড়ির চালকের চাকরি আঁকড়ে ধরে আছেন এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, চসিকের এই সাধারণ চালকের পর্দার আড়ালের মূল উৎস ও তেল চুরির সিন্ডিকেট তদন্ত করলে থলের বেড়াল বেরিয়ে আসবে।
সাঈদুল রহমান সাকিব 












