
সাঈদুল রহমান সাকিব : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বহদ্দারহাট বড়াইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান করতে গিয়ে খোদ প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। প্রকল্পের নিয়মনীতি ও আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জমির মালিকের কাছে মোটা অঙ্কের নগদ টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে। সেই দাবি মেটাতে না পারায় এক ভুক্তভোগী পরিবারকে উচ্ছেদ করে সর্বস্বান্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে চসিকের সার্ভেয়ার লিটন দাশ এবং প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ফরহাদুল আলমের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী মো. হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, তাঁর পৈতৃক ভিটেমাটি এবং বসতঘর রক্ষার আইনি লড়াইয়ের পথ রুদ্ধ করে তাঁকে মানবেতর জীবনের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আদেশের কাগজ পকেটে, বুলডোজার মাঠে:
ঘটনার সূত্রপাত চান্দথানা থানাধীন নাজির রোড বড়াইপাড়া এলাকায়। খাল খনন প্রকল্পের আওতাধীন বিএস ৪৯২ নম্বর দাগের খতিয়ানভুক্ত বসতঘর ও জমির ওপর প্রকল্পের কাজ চলাকালে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়। প্রতিকার চেয়ে সংক্ষুব্ধ হাবিবুর রহমান মহামান্য হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালত ওই সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা (status quo) বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
নিয়ম অনুযায়ী আদালতের এই নির্দেশ পাওয়ার পর কাজ স্থগিত বা আইনি সুরাহা হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পিডি ফরহাদুল আলম ও সার্ভেয়ার লিটন দাশ আদালতের সেই নির্দেশকে তোয়াক্কা করেননি। ৪৯২ নম্বর দাগের সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত রেখা (বাউন্ডারি) নিরূপণ না করেই তাঁরা বুলডোজার নিয়ে হাজির হন। আদালতের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকার পরও তা কৌশলে এড়িয়ে নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত প্রায় দেড় কাঠা জমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে বসতঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
টাকা না দিলে মিলবে না ক্ষতিপূরণ, শুরু হয় হয়রানি : অনুসন্ধানে জানা যায়, এই পুরো প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সার্ভেয়ার লিটন দাশের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প থেকে অধিগ্রহণ করা জমির প্রত্যেক মালিকের কাছ থেকে নানা উপায়ে অনৈতিক সুবিধা বা উৎকোচ আদায় করা হয়েছে।
হাবিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তাঁর কাছে সার্ভেয়ার লিটন দাশ ও পিডি ফরহাদুল আলম নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ টাকা দাবি করেন। সেই ঘুষের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। আদালতের নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকা সত্ত্বেও তা বেপরোয়াভাবে লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত জায়গা জুড়ে ভাঙচুর চালানো হয়। এতে সহায়-সম্পদ হারিয়ে বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে হচ্ছে হাবিবুর রহমানের পরিবারকে।
তবে এবিষয়ে অভিযুক্ত লিটন দাশের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, অসুস্থতা কারণে ছুটিতে আছেন এবিষয়ে প্রশ্ন করতে লাইন কেটে দেন।
পিডি ফরহাদুল আলমের সাথে সরজমিন প্রজেক্ট এলাকায় কথা বলতে চাইলে তিনিও প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে রাজি হয় নি
মেয়রের দপ্তরে ও জেলা প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ : নিজের ওপর চলা এই অবিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিকার চেয়ে গত ৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগী হাবিবুর রহমান।
অভিযোগে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, সার্ভেয়ার লিটন ও পিডি ফরহাদ যোগসাজশ করে আদালতের আদেশকে অবজ্ঞা করেছেন এবং সঠিক সীমানা নির্ধারণ না করেই তাঁর বসতঘর ভেঙে দিয়েছেন।
শুধু চসিক নয়, এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) শাখায় বদ্দারহাট বড়াইপাড়া হইতে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পের এলএসিপি কেইস নম্বর ১৭/২০২৫-২০২৬-এর বিএস ৪৯২ দাগের সীমানা নির্ধারণের জন্য যৌথ সার্ভে করার অনুরোধ জানিয়েও একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন হাবিবুর রহমান। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সুরাহা পাননি এই ভুক্তভোগী।
বড় ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি মেগা প্রকল্পের নামে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার এমন স্বেচ্ছাচারিতা পুরো প্রকল্পটির স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভুক্তভোগী হাবিবুর রহমানের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পর এই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ও সার্ভে কার্যক্রমে অনিয়মের আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে।
সার্ভেয়ার লিটন দাশ ও পিডি ফরহাদুল আলমের সিন্ডিকেটের দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র নিয়ে আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরবর্তী ২য় পর্ব খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হবে।
সাঈদুল রহমান সাকিব 















