ঢাকা ০২:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩

মেয়রের পরিশ্রম ধূলিসাৎ; চসিকে প্রকৌশলীর কমিশন ‘ফাঁদ’ টাকা না দিলে আটকে থাকে ফাইল!

সাঈদুল রহমান সাকিব : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যেকোনো কাজের টেন্ডার অনুমোদন থেকে শুরু করে বিল ছাড় করা—সর্বত্রই তাকে দিতে হয় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন। এমনকি ভ্যাট ও ট্যাক্সের নির্ধারিত অর্থ থেকেও তাকে বখরা দিতে হয় বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের। কমিশন না দিলে ফাইলের অনুমোদন মেলেনি, উল্টো পোহাতে হয় নানা হয়রানি।

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে যেখানে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দিনরাত পরিশ্রম করছেন, সেখানে কতিপয় কর্মকর্তার এই সীমাহীন দুর্নীতির কারণে ভেস্তে যাচ্ছে সব উদ্যোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, দরপত্রের ফাইল থেকে শুরু করে রাজস্ব খাতের উন্নয়ন কাজের চূড়ান্ত বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী ও তার চক্রকে অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

চসিক সূত্র জানায়, বর্তমানে সংস্থায় প্রায় চার হাজার ৮০০ কোটি টাকার চারটি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে আড়াই হাজার কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন, এক হাজার ২৩০ কোটি টাকার অবকাঠামো ও বাস টার্মিনাল নির্মাণ, এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার বাড়ইপাড়া খাল এবং ৩০৯ কোটি টাকার সেবক নিবাস প্রকল্প অন্যতম। এসব প্রকল্পে বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এসব উন্নয়ন কাজের অনুমোদন ও বিল ছাড় করাতে গিয়ে প্রধান প্রকৌশলী একাই বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা কমিশন বাবদ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়া রাজস্ব খাতের অর্থ দিয়ে প্রতি বছর যে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মেরামত কাজ করা হয়, সেটির প্রাথমিক এস্টিমেট ও চূড়ান্ত বিল পাসের সময়ও আলাদাভাবে ২ শতাংশ কমিশন আদায় করা হয়।

নিম্নমানের কাজ ও সরকারি অর্থের অপচয়: 
ধারাবাহিক এই কমিশন বাণিজ্যের সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ নগরবাসীকে। ঠিকাদারদের বক্তব্য, চসিকের বিভিন্ন টেবিলে দফায় দফায় মোটা অংকের কমিশন উৎকোচ হিসেবে দেওয়ার পর তাদের কাছে লাভের অংশ থাকে সামান্যই। ফলে বাধ্য হয়েই কাজের মান খারাপ করতে হয় এবং নিম্নের সামগ্রী ব্যবহার করতে হয়। এতে হস্তান্তরের কিছুদিন পরই সড়ক বা অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যায় এবং নতুন করে আবার সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

বর্তমানে চসিক প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দেনার বোঝা নিয়ে অর্থসংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের বেপরোয়া দুর্নীতি প্রতিহত করা না গেলে সংস্থার আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের কার্যালয়ে কয়েকবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

অন্যদিকে, বিষয়টিতে চসিকের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আশরাফুল আমিন জানান, অভিযোগটির বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে লিখিত বা সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ঠিকাদারদের দাবি, চসিকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে প্রকাশ্যে কারো নামে অভিযোগ দেওয়া অসম্ভব। অভিযোগ করলে চসিকে তাদের কাজের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে—এমন আশঙ্কায় তারা মুখ খুলতে পারেন না।

ট্যাগস :

মেয়রের পরিশ্রম ধূলিসাৎ; চসিকে প্রকৌশলীর কমিশন ‘ফাঁদ’ টাকা না দিলে আটকে থাকে ফাইল!

মেয়রের পরিশ্রম ধূলিসাৎ; চসিকে প্রকৌশলীর কমিশন ‘ফাঁদ’ টাকা না দিলে আটকে থাকে ফাইল!

আপডেট সময় : ০১:১৬:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাঈদুল রহমান সাকিব : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যেকোনো কাজের টেন্ডার অনুমোদন থেকে শুরু করে বিল ছাড় করা—সর্বত্রই তাকে দিতে হয় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন। এমনকি ভ্যাট ও ট্যাক্সের নির্ধারিত অর্থ থেকেও তাকে বখরা দিতে হয় বলে অভিযোগ ঠিকাদারদের। কমিশন না দিলে ফাইলের অনুমোদন মেলেনি, উল্টো পোহাতে হয় নানা হয়রানি।

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে যেখানে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দিনরাত পরিশ্রম করছেন, সেখানে কতিপয় কর্মকর্তার এই সীমাহীন দুর্নীতির কারণে ভেস্তে যাচ্ছে সব উদ্যোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, দরপত্রের ফাইল থেকে শুরু করে রাজস্ব খাতের উন্নয়ন কাজের চূড়ান্ত বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী ও তার চক্রকে অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

চসিক সূত্র জানায়, বর্তমানে সংস্থায় প্রায় চার হাজার ৮০০ কোটি টাকার চারটি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে আড়াই হাজার কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন, এক হাজার ২৩০ কোটি টাকার অবকাঠামো ও বাস টার্মিনাল নির্মাণ, এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার বাড়ইপাড়া খাল এবং ৩০৯ কোটি টাকার সেবক নিবাস প্রকল্প অন্যতম। এসব প্রকল্পে বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এসব উন্নয়ন কাজের অনুমোদন ও বিল ছাড় করাতে গিয়ে প্রধান প্রকৌশলী একাই বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা কমিশন বাবদ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়া রাজস্ব খাতের অর্থ দিয়ে প্রতি বছর যে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মেরামত কাজ করা হয়, সেটির প্রাথমিক এস্টিমেট ও চূড়ান্ত বিল পাসের সময়ও আলাদাভাবে ২ শতাংশ কমিশন আদায় করা হয়।

নিম্নমানের কাজ ও সরকারি অর্থের অপচয়: 
ধারাবাহিক এই কমিশন বাণিজ্যের সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ নগরবাসীকে। ঠিকাদারদের বক্তব্য, চসিকের বিভিন্ন টেবিলে দফায় দফায় মোটা অংকের কমিশন উৎকোচ হিসেবে দেওয়ার পর তাদের কাছে লাভের অংশ থাকে সামান্যই। ফলে বাধ্য হয়েই কাজের মান খারাপ করতে হয় এবং নিম্নের সামগ্রী ব্যবহার করতে হয়। এতে হস্তান্তরের কিছুদিন পরই সড়ক বা অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যায় এবং নতুন করে আবার সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

বর্তমানে চসিক প্রায় ৩০০ কোটি টাকার দেনার বোঝা নিয়ে অর্থসংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের বেপরোয়া দুর্নীতি প্রতিহত করা না গেলে সংস্থার আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের কার্যালয়ে কয়েকবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

অন্যদিকে, বিষয়টিতে চসিকের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আশরাফুল আমিন জানান, অভিযোগটির বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে লিখিত বা সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ঠিকাদারদের দাবি, চসিকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে প্রকাশ্যে কারো নামে অভিযোগ দেওয়া অসম্ভব। অভিযোগ করলে চসিকে তাদের কাজের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে—এমন আশঙ্কায় তারা মুখ খুলতে পারেন না।