সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশে কেবল একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের পৌরহিত্য করেছিলেন তাই নয়, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্মূল ও পঙ্গু করে ফেলার জন্য অপরাধবিদ্যায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এমন যাবতীয় শাস্তিমূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে তিনি বিচারিক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন। আইন প্রয়োগকারীদের ব্যবহার করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মূলমন্ত্র ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’-এর পরিবর্তে ‘এনকাউন্টার’ ও ‘ক্রসফায়ার’ হয়ে উঠেছিল তাঁদের পরিভাষা। তিনি তাঁর অপছন্দনীয় ব্যক্তিদের বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটকে রেখেছেন। রাজনৈতিক নেতাদের গুম করেছেন, যাঁদের অনেকের খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। তাঁর দলের ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে তিনি সব ধরনের সমর্থন ও সহায়তা করেছেন। তাঁর আমলে সমগ্র বাংলাদেশ এক উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছিল। জনগণের প্রতিবাদের ভাষা যেহেতু কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, অতএব একের পর এক ভোটারহীন নির্বাচনে তাঁর দলের বিজয় ঘোষণা করে তিনি প্রধানমন্ত্রিত্বের আসনকে প্রায় চিরস্থায়ীই করে ফেলেছিলেন। তিনি সবই করেছেন, কিন্তু জনগণের অন্তরে তাঁর বিরুদ্ধে কীভাবে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে, তা বুঝতে পারেননি। এই বুঝতে না পারা তাঁর একার অজ্ঞতা ছিল না। অতীতের কর্তৃত্ববাদীরাও ক্ষমতার দম্ভে তা বোঝেননি। ভবিষ্যতের অনেক শাসকও যে তা বুঝবেন না, তা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ।
শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পরিণতিই বিএনপির সুষ্ঠুভাবে সরকার পরিচালনার পাথেয় বা নির্দেশিকা হতে পারে। যেকোনো সরকারের জন্যই মুখ্য বিষয় হলো, জনগণ যে আস্থায় একটি দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসায়, তাঁদের সে আস্থার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে গণতন্ত্রকে কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার বাহন হিসেবে ব্যবহার না করা। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে, নাশকতা চালিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা না করে, ততক্ষণ রাজনৈতিক উপায়েই তাঁদের মোকাবিলা করা। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সংবিধান-স্বীকৃত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং আইনের আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করলে শুধু যে প্রতিপক্ষ দলগুলো ক্ষুব্ধ হয় তা নয়, ব্যাপক অর্থে জনগণের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। শেখ হাসিনা এসবের তোয়াক্কা করেননি। বিএনপির মতো জনপ্রিয় তৃণমূল পর্যায়ে বিশাল জনগোষ্ঠী দ্বারা সমর্থিত একটি দলকে রাজনীতির বাইরে রাখতে শেখ হাসিনা আইনবহির্ভূত পন্থায় যা ইচ্ছা তাই করেছেন। ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হিসেবে তিনি প্রথমে তাঁর দুর্বল শিকার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীকে। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী জামায়াতকে সাইজ করা সম্পন্ন হলেই বিএনপি নেতৃত্বের একটি অংশকে নির্মূল করে ফেলতে তাঁকে বেগ পেতে হতো না। জামায়াত সাংগঠনিক শক্তি ও কাঠামোর কারণে টিকে গেলেও বিএনপি অনুরূপ অবস্থায় পড়লে দলটির টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত। যা হোক, গণ অভ্যুত্থান শেখ হাসিনাকে সে সুযোগ দেয়নি। এসবই ছিল তাঁর মৃত্যুর পর পরিবার অথবা দলের শাসনকে চিরস্থায়ী করার পরিকল্পনার অংশ।
‘খালি কলসি বেশি বাজে’ বলে যে প্রবাদ প্রচলিত আছে, আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র তেমনি ফাঁকা বুলি। তাঁদের গণতান্ত্রিক শাসন গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণের নকশা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা, দলীয় কাহিনিকে জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসে পরিণত করা, আইনি নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা, উচ্চশিক্ষার ওপর আক্রমণ এবং ভিন্নমতের দানবীয় দমন করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ কায়েম করা। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলীয় আধিপত্যের এই রূপ গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর ও তাঁর দলের অবজ্ঞা আড়াল করে রাখেনি। গণতন্ত্রকে তিনি তাঁর আঁচলে গিঁট দিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর কর্তৃত্ববাদে রাষ্ট্র আর জনগণের ছিল না। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি ভেঙে গিয়েছিল তাঁর ফ্যাসিবাদী নির্মমতায়। বিচারব্যবস্থা দলীয়করণের মাধ্যমে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পাঠানো হয়েছিল নির্বাসনে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের ইতিহাস এখন সামনে উন্মুক্ত এবং এ ইতিহাস এত তাজা যে, তাদের প্রতিটি দুর্বৃত্তায়ন ক্ষমতাসীন ও যারা নিকট ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যেতে আগ্রহী তাদের জন্য শিক্ষণীয়। আমেরিকান লেখক ও নাগরিক অধিকার প্রবক্তা জেমস বাল্ডউইন জোরালো ভাষায় বলেছেন, ‘কোনো কিছুই পরিবর্তন করা যায় না, যতক্ষণ না আমরা সেগুলোর মুখোমুখি হই।’ দেশ ও জাতি আওয়ামী শাসনে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল, গণ অভ্যুত্থানে তাঁর অবসান ঘটেছে এবং পরিবর্তন আনার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে বিএনপি সরকারের ওপর।
বিএনপি সরকারের সাফল্য মূল্যায়নের জন্য তাঁদের শাসনের সাড়ে পাঁচ মাস দীর্ঘ সময় নয়। তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পূর্ববর্তী ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আঠারো বছর দেশ শাসনকারী তিনটি রেজিম দেশের প্রতিটি খাতে যে জঞ্জাল সৃষ্টি করেছে, তা কাটিয়ে উঠে রাতারাতি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু ভালো কিছু করার জন্য সময়ের অপেক্ষা সব সময় সুফল বয়ে আনে না। ‘লোহা গরম থাকতেই আঘাত কর’ বলে কথা প্রচলিত আছে, বিএনপি সরকার সেটি মাথায় রেখে যত দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে, সরকারের ওপর জনগণের আস্থা তত বৃদ্ধি পাবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি, শিল্প খাতে অস্থিরতা, দেশজুড়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে চলা চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের মাঝে হতাশা বাড়ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশ যে দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়েছিল, তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের যা যা করা প্রয়োজন, সেসব পদক্ষেপ গ্রহণে সময় ক্ষেপণের সুযোগ নিয়ে পুরোনো দুর্বৃত্তরাই আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। সরকারের প্রতি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি জনসমর্থন ও গণমাধ্যমের মনোযোগ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। অতএব এখনই জঞ্জাল পরিচ্ছন্ন করার উপযুক্ত সময়।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক
প্রতিনিধির নাম 




























