
মোহাম্মদ রোমন, সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাফরনগর অর্পণা চরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির ছয় ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এক ছাত্রীর কাছ থেকে ‘সেডিল’ ট্যাবলেট উদ্ধারের কথা স্বীকার করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে ওই ট্যাবলেট ঘুমের ওষুধ, নাকি নেশাজাতীয় কোনো পদার্থ—এ নিয়ে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যেই তৈরি হয়েছে গুরুতর ধোঁয়াশা।
ঘটনাটি ঘটে গত ২ সেপ্টেম্বর। অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে শিক্ষকরা তাকে প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তার জুতা-মোজার ভেতর থেকে ‘সেডিল’ ট্যাবলেট পাওয়ার কথা জানান প্রধান শিক্ষক শ্যামল কুমার নাথ।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, পরে অনুসন্ধানে আরও কয়েকজন ছাত্রীর কাছে একই ধরনের ট্যাবলেট সংগ্রহ ও সেবনের তথ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় মোট ছয় -সাতজন ছাত্রীকে সংশ্লিষ্ট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রধান শিক্ষক শ্যামল কুমার নাথের ভাষ্য, অসুস্থ হয়ে পড়া এক ছাত্রীর জুতা-মোজার ভেতর থেকে ‘সেডিল’ ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। ওই ছাত্রী নিজে ট্যাবলেট সেবনের পাশাপাশি কয়েকজন বন্ধুকেও তা খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে বলেও জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক আরও দাবি করেন, অভিভাবকদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ওই ছাত্রী মীরেরহাট এলাকার একটি ফার্মেসি থেকে ট্যাবলেট সংগ্রহ করেছিল। পরিবারের এক সদস্যের ওষুধের সুযোগ নিয়ে সে ট্যাবলেটগুলো নিয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তবে এখানেই সামনে এসেছে একাধিক প্রশ্ন—একজন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী কেন ট্যাবলেট জুতা-মোজার ভেতর লুকিয়ে বিদ্যালয়ে আনবে? কোথা থেকে পেল সে এসব ট্যাবলেট? আর কেনই বা অন্য শিক্ষার্থীদের তা খাওয়ানোর চেষ্টা করবে?
এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি বিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্যে।
‘নেশা জাতীয় ট্যাবলেট’—প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন ঘটনাটিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে প্রধান শিক্ষকের আরেক বক্তব্য।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কুমার নাথকে বলতে শোনা যায়, ছাত্রীরা ‘নিশা জাতীয়’ ট্যাবলেট সেবন করেছে। তবে সেটি ঠিক কী ধরনের ট্যাবলেট- ঘুমের ওষুধ, নাকি মাদকজাতীয় কোনো পদার্থ—সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো তথ্য দেননি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি ‘সেডিল’ ট্যাবলেট উদ্ধারের কথা বলে থাকে, তাহলে সেটিকে আবার ‘নিশা জাতীয়’ ট্যাবলেট হিসেবে উল্লেখ করার কারণ কী?
ট্যাবলেটের প্রকৃত ধরন ও উপাদান পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে মাদক হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত করার সুযোগ নেই। তবে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যের অসঙ্গতির কারণে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী দাবি করেছে, ছয় -সাত ছাত্রী শ্রেণিকক্ষে বসে মাদকজাতীয় কিছু সেবন করেছিল। এরপর তাদের মাথা ঘুরতে শুরু করে এবং কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়ে।
পরে অভিভাবকরা বিদ্যালয়ে এসে তাদের নিয়ে যান বলেও দাবি করেছে ওই শিক্ষার্থীরা।
তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃতপক্ষে কী সেবনের পর ছাত্রীরা অসুস্থ হয়েছিল, তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা নথি ও সংশ্লিষ্ট ট্যাবলেটের পরীক্ষা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে কোনো শিক্ষার্থী মাদক সেবন করেনি বলে দাবি করেছেন প্রধান শিক্ষক শ্যামল কুমার নাথ। তবে বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের সিগারেট সেবনের বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—শ্রেণিকক্ষে মাদক সেবনের ঘটনা না ঘটলে এক ছাত্রীর কাছে গোপনে ট্যাবলেট এলো কীভাবে? সেটি বিদ্যালয়ে আনা হলো কেন? এবং কী উদ্দেশ্যে অন্য শিক্ষার্থীদের তা খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল?
সভাপতির বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র
ঘটনার বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে জানানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধান শিক্ষক।
তবে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বক্তব্যে এর সঙ্গে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বিষয়টি আগে থেকে অবগত ছিলেন না।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনায় পরিচালনা কমিটিকে জানানো হয়ে থাকলে সভাপতি ও অভিভাবক সদস্যরা বিষয়টি জানলেন না কেন?
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর দাবি, অভিযুক্ত ছাত্রীদের কয়েকজনের বেপরোয়া চলাফেরা নিয়ে এর আগেও আলোচনা হয়েছে। তাদের আচরণ নিয়ে বিদ্যালয়ে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে বলে দাবি তাদের।তবে এসব অভিযোগের পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যালয়ের আশপাশে বহিরাগত তরুণদের আড্ডা, শিক্ষার্থীদের অবাধ চলাফেরা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকটকসহ বিভিন্ন ভিডিও তৈরি ও প্রকাশ নিয়ে আগেও নানা অভিযোগ ছিল।
তাদের প্রশ্ন—বিদ্যালয়ের আশপাশে বহিরাগতদের আড্ডা থাকলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলো না কেন? শিক্ষার্থীদের আচরণ নিয়ে আগে অভিযোগ থাকলে কার্যকর নজরদারি ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
গুজব’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সব অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেই এক ছাত্রীর কাছ থেকে ‘সেডিল’ ট্যাবলেট উদ্ধারের কথা এবং ছয়-সাত ছাত্রীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
তাই ঘটনাটিকে কেবল ‘গুজব’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটা—এ প্রশ্ন তুলছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, শুধু কয়েকজন অভিভাবককে ডেকে সতর্ক করলেই ঘটনার দায় শেষ হয় না। ট্যাবলেট কোথা থেকে এলো, কে সরবরাহ করেছে, কোনো ফার্মেসি বা ব্যক্তি এতে জড়িত কি না, বিদ্যালয়ের ভেতরে বা বাইরে কোনো চক্র সক্রিয় কি না এবং এর আগে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
অভিভাবক ও স্থানীয়দের মতে, বিষয়টি ধামাচাপা না দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ট্যাবলেট পরীক্ষা করে এর প্রকৃত উপাদান শনাক্ত করা, অসুস্থ ছাত্রীদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই এবং ট্যাবলেটের উৎস অনুসন্ধান করা জরুরি।
পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীদের নজরদারি, বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বে কোনো গাফিলতি ছিল কি না-তাও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে—
অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জুতা-মোজার ভেতর ট্যাবলেট লুকিয়ে বিদ্যালয়ে আনল কীভাবে?ট্যাবলেটগুলো কোথা থেকে এলো?
কেন অন্য শিক্ষার্থীদের তা খাওয়ানোর চেষ্টা করা হলো?ছয়-সাত ছাত্রী একই ঘটনায় কীভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ল?উদ্ধার হওয়া ট্যাবলেট আসলে কী ধরনের ওষুধ বা পদার্থ?
এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে ঘটনাটিকে নিছক ‘ছাত্রী অসুস্থ হওয়ার ঘটনা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশের স্বার্থে ঘটনার প্রকৃত কারণ, ট্যাবলেটের উৎস এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনা জরুরি।
প্রতিনিধির নাম 















