
সাঈদুল রহমান সাকিব :একসময় যেই ট্রেনকে সবচেয়ে নিরাপদ গণপরিবহন হিসেবে বিবেচনা করা হতো এখন সেই ট্রেনের যাত্রীনিরাপত্তাই যেন প্রশ্নের মুখে।
নির্ধারিত গতিতে ছুটে চলা ট্রেনে হঠাৎ ছুটে আসে উচ্চগতির ইট বা পাথর। এতে মুহূর্তেই ভেঙে যায় জানালার কাচ, রক্তাক্ত হন সাধারণ যাত্রীরা, আতঙ্কে ছড়িয়ে পড়ে পুরো বগিতে।
রেল সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন রুটে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে এমন বহু ঘটনা।
বছেরর পর বছর চলতে থাকা এই অপরাধ বন্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ে, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানা উদ্যোগ নিলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ।
শুধু যাত্রীদের জীবনই নয়, এই অপরাধের কারণে প্রতিবছর রাষ্ট্রেরও গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কারণে ভাঙা দরজা, জানালা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ মেরামতে ব্যয় করতে হচ্ছে বছরে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরেই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক যাত্রী। আহতদের মধ্যে অনেকেই মাথা, মুখ ও চোখে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে এমন ঘটনায় স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন বহু যাত্রী। এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, চলন্ত ট্রেনে জানালার কাচ ভেদ করে ছুটে আসা একটি পাথরের আঘাত অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। কারণ ট্রেনের গতির সঙ্গে পাথরের গতি যুক্ত হয়ে আঘাতের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় বেশ কয়েকগুণ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় প্রায় আড়াই হাজার দরজা ও জানালার কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব মেরামত এবং কাচ প্রতিস্থাপনে ব্যয় করতে হয়েছে বিপুল পরিমান অর্থ।
জানা যায়, প্রতিবছর গড়ে অন্তত দেড় শতাধিক পাথর নিক্ষেপের ঘটনা রেকর্ড করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অনেক ছোটখাটো ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
রেলওয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ২০টি জেলায় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ও প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৫টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১৫টি জেলা রয়েছে।
এছাড়াও সারা দেশে মোট ৬৫টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৩৬টি স্পট ও পশ্চিমাঞ্চলে ২৯টি স্পট।
এই এলাকাগুলোতে ট্রেন চলাচলের সময় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রেললাইনের পাশে বসবাসকারী কিছু কিশোর, বখাটে কিংবা মাদকাসক্ত ব্যক্তি এসব ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করা হয়।
রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিনোদনের উদ্দেশ্যে অসচেতনভাবে পাথর ছোড়া, কিশোরদের অপরিণত মানসিকতা, ক্ষোভ বা প্রতিশোধমূলক আচরণ, মাদকাসক্তদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড, সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতার অভাব ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্ত না হওয়া।
রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি নিছক দুষ্টুমি নয়, বরং একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। একটি ছোট পাথরও একজন মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।
রেল সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে ১৮৫৩ সালে উপমহাদেশে ট্রেন চালুর পর থেকেই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হলেও এই অপরাধ বন্ধ হয়নি।
বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, রেললাইনের দুই পাশে অনিয়ন্ত্রিত বসতি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে কিছু এলাকায় এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, বর্তমানে সমস্যাটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এছাড়াও তিনি জানান, “ট্রেনের গার্ড, কর্মচারী ও যাত্রীরা নিয়মিত আহত হচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। রেল নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) এবং পুলিশ বিষয়টি তদারকি করছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোতে লিফলেট বিতরণ ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।”
মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন আরও জানান, এসব প্রচারণার ফলে আগের তুলনায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে কিছু মাদকাসক্ত ও অসচেতন ব্যক্তি এখনও এই অপরাধ করে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে রেল বিশ্লেষক মোহাম্মদ হোসেন সিটিজি পোস্টকে বলেন, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। কাজ করতে হবে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে, রেলপথ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি রেলপথসংলগ্ন এলাকার থানা, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
তার মতে, শিশু-কিশোরদের ছোটবেলা থেকেই বোঝাতে হবে যে চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়া কোনো খেলা নয়, এটি মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে।
তথ্য বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি বিষয়। প্রথমত, অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীদের শনাক্ত করা যায় না। ট্রেন চলন্ত অবস্থায় মুহূর্তের মধ্যে পাথর ছুড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের ধরতে বেগ পেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
এছাড়া রেললাইনের দীর্ঘ অংশজুড়ে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব রয়েছে। হাজার হাজার কিলোমিটার রেলপথে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বেশ কঠিন।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার ঘাটতি এখনও বড় সমস্যা। অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাদের একটি কাজ কারও জীবন বিপন্ন করতে পারে।
সর্বশেষ, শিশু-কিশোরদের একটি অংশ কৌতূহল বা বিনোদনের বশে এই কাজ করে থাকে। পরিবার থেকে যথাযথ শিক্ষা ও তদারকি না থাকায় তারা অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে না।
রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া জরুরি আরো কার্যকর পদক্ষেপ। এরমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৬৫টি স্পটে সার্বক্ষণিক নজরদারি বৃদ্ধি, আরএনবি ও পুলিশের যৌথ টহল জোরদার, রেললাইনের পাশে সিসিটিভি ও আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা কর্মসূচি, স্কুলভিত্তিক প্রচারণা চালিয়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা ও নিয়মিত গণমাধ্যম প্রচারণা ও জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা।
কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ দিয়ে এই অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সচেতনতাই হতে পারে এই ব্যাধি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সাঈদুল রহমান সাকিব 

















