ঢাকা ০৬:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

মিথ্যা বিয়ে আর আশ্বাসের জাল: প;র্নো;গ্রা;ফি বিক্রি ও ব্ল্যাকমেইলে নিঃস্ব এক তরুণীর জীবন

সাইদুল রহমান সাকিব , চট্টগ্রাম: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি সাধারণ পরিচয় কীভাবে একজন মানুষের জীবনকে সর্বনাশের খাদের কিনারায় ঠেলে দিতে পারে, তার এক নির্মম ও হাড়হিম করা চিত্র উঠে এসেছে চট্টগ্রামের এক তরুণীর জীবনে। বিয়ের প্রলোভন, শারীরিক সম্পর্কের ফাঁদ, পিতৃপরিচয় অস্বীকার, ব্ল্যাকমেইল এবং সর্বশেষ অজান্তে ধারণ করা অন্তরঙ্গ ভিডিও পর্নোগ্রাফি সাইটে বিক্রির এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে কাওছার আজীম আসিফ নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে।

২০১৮ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে কাওছার আজীম আসিফের সঙ্গে পরিচয় হয় নাহিদা হক মুনা নামের এক তরুণীর। পরিচয়ের সূত্র ধরে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। ভুক্তভোগী তরুণীর অভিযোগ, বিয়ের সুদৃঢ় আশ্বাসের ভিত্তিতে আসিফ তার সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। একপর্যায়ে তরুণী গর্ভবতী হয়ে পড়লে শুরু হয় আসিফের আসল রূপ। গর্ভপাত ঘটাতে বারবার চাপ দিতে থাকে সে। কিন্তু সব সামাজিক ও মানসিক বাধা মাথায় নিয়েও তরুণী জন্ম দেন এক কন্যাসন্তানের।

সন্তান পৃথিবীতে আসার পর থেকেই শুরু হয় আসিফের নির্মম অস্বীকার। কোনো উপায় না পেয়ে তরুণী আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালতের নির্দেশে সিআইডি বা সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ডিএনএ টেস্ট সম্পন্ন হয়। সেই ডিএনএ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, শিশুটির জৈবিক পিতা কাওছার আজীম আসিফ।

আদালতের রায়ের পর একটি সমঝোতা বৈঠকে আসিফ প্রতিশ্রুতি দেয় যে, সে আদালতের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে তরুণী ও তার সন্তানকে নিজের ঘরে তুলে নেবে এবং আইনি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করবে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি কেবল কালক্ষেপণের একটি নিখুঁত কৌশল ছিল। এর আড়ালে আসিফ গোপনে একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করে দেয়।

ভাঙল নতুন বিয়ে, শুরু ব্ল্যাকমেইলের পৈশাচিক খেলা

দীর্ঘদিন ধরে ধোঁকায় থাকার পর তরুণী যখন জীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর কথা ভাবেন এবং অন্য এক পাত্রের সঙ্গে তার বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়, তখন ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে আসিফ। পুরনো কৌশলে সে তরুণীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালায়। তবে এবার সে সফল হয়নি। প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আসিফ তরুণীর হবু শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে তার আগের সন্তান থাকার বিষয়টি ফাঁস করে দেয়। শুধু তাই নয়, অতীতে আসিফের সঙ্গে কাটানো কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও কৌশলে ছড়িয়ে দিয়ে বিয়ের ঠিক ৯ দিন আগে সেই আয়োজন ভেঙে দেয় সে।

মানসিকভাবে ভেঙে পড়া তরুণীকে এরপর আবারও ‘ভালোবাসা ও সুন্দর সংসার’ দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাসে নিজের জালে ফেরান আসিফ। আর তখনই তার মাথায় আসে আরও ভয়ংকর ও পৈশাচিক এক পরিকল্পনা।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বাচ্চার মা হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিলাসবহুল হোটেলে তাকে নিয়ে যেত আসিফ। সেখানে সুকৌশলে তরুণীর অজান্তেই আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিওগুলো বিভিন্ন বিদেশি পর্নোগ্রাফি ও নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে বিক্রি করা শুরু করে সে। প্রায় শতাধিক ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে বিক্রির এক অসুস্থ নেশায় মেতে ওঠে এই যুবক।

নতুন বিয়ে ও লুকোচুরি

গত ১৬ আগস্টও ওই তরুণীর সঙ্গে বাসায় রাত কাটায় আসিফ। কিন্তু এর পরদিনই, অর্থাৎ ১৭ আগস্ট নগরীর বহদ্দারহাট ফরিদার পাড়া এলাকায় নিজের ৬ বছরের কন্যাসন্তান ও আগের সমস্ত সম্পর্কের কথা সম্পূর্ণ গোপন করে সম্পূর্ণ নতুন এক তরুণীকে বিয়ে করে সে।

এই খবর পাওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে আকাশ ভেঙে পড়ে প্রথম ভুক্তভোগীর মাথায়। তিনি ছুটে যান আসিফের আগ্রাবাদ মৌলবি পাড়া বিউটি ম্যানশন সংলগ্ন বাড়িতে। কিন্তু আসিফ সাফ জানিয়ে দেয়, সে কাউকে বিয়ে করেনি এবং তরুণীকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। নিজের ও সন্তানের অধিকারের কথা তুললে আসিফ এবার হাতে নেয় তার পুরোনো অস্ত্র—গোপনে ধারণ করা আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি।

আইনের মুখোমুখি আসিফ, বর্তমানে পলাতক

কোণঠাসা ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া তরুণী শেষ পর্যন্ত স্থানীয় থানা এবং আদালতে আইনি পদক্ষেপ নেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন সিএমপির বন্দর থানাকে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন এস আই স্বর্ণালী মজুমদার।  বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই আসিফ বর্তমানে পলাতক রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে আসিফের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা বন্দর থানা পুলিশ, একটি পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং আরেকটি সিআইডির নিবিড় তদন্তাধীন রয়েছে।

একজন নারীর সরলতা ও বিশ্বাসের চরম অপব্যবহার করে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং পর্নোগ্রাফি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কাওছার আজীম আসিফকে গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম বর্তমানে অভিযান চালাচ্ছে। তবে ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে থাকায় অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

মিথ্যা বিয়ে আর আশ্বাসের জাল: প;র্নো;গ্রা;ফি বিক্রি ও ব্ল্যাকমেইলে নিঃস্ব এক তরুণীর জীবন

মিথ্যা বিয়ে আর আশ্বাসের জাল: প;র্নো;গ্রা;ফি বিক্রি ও ব্ল্যাকমেইলে নিঃস্ব এক তরুণীর জীবন

আপডেট সময় : ০৬:৫৪:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাইদুল রহমান সাকিব , চট্টগ্রাম: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি সাধারণ পরিচয় কীভাবে একজন মানুষের জীবনকে সর্বনাশের খাদের কিনারায় ঠেলে দিতে পারে, তার এক নির্মম ও হাড়হিম করা চিত্র উঠে এসেছে চট্টগ্রামের এক তরুণীর জীবনে। বিয়ের প্রলোভন, শারীরিক সম্পর্কের ফাঁদ, পিতৃপরিচয় অস্বীকার, ব্ল্যাকমেইল এবং সর্বশেষ অজান্তে ধারণ করা অন্তরঙ্গ ভিডিও পর্নোগ্রাফি সাইটে বিক্রির এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে কাওছার আজীম আসিফ নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে।

২০১৮ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে কাওছার আজীম আসিফের সঙ্গে পরিচয় হয় নাহিদা হক মুনা নামের এক তরুণীর। পরিচয়ের সূত্র ধরে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। ভুক্তভোগী তরুণীর অভিযোগ, বিয়ের সুদৃঢ় আশ্বাসের ভিত্তিতে আসিফ তার সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। একপর্যায়ে তরুণী গর্ভবতী হয়ে পড়লে শুরু হয় আসিফের আসল রূপ। গর্ভপাত ঘটাতে বারবার চাপ দিতে থাকে সে। কিন্তু সব সামাজিক ও মানসিক বাধা মাথায় নিয়েও তরুণী জন্ম দেন এক কন্যাসন্তানের।

সন্তান পৃথিবীতে আসার পর থেকেই শুরু হয় আসিফের নির্মম অস্বীকার। কোনো উপায় না পেয়ে তরুণী আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালতের নির্দেশে সিআইডি বা সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ডিএনএ টেস্ট সম্পন্ন হয়। সেই ডিএনএ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, শিশুটির জৈবিক পিতা কাওছার আজীম আসিফ।

আদালতের রায়ের পর একটি সমঝোতা বৈঠকে আসিফ প্রতিশ্রুতি দেয় যে, সে আদালতের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে তরুণী ও তার সন্তানকে নিজের ঘরে তুলে নেবে এবং আইনি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করবে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি কেবল কালক্ষেপণের একটি নিখুঁত কৌশল ছিল। এর আড়ালে আসিফ গোপনে একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করে দেয়।

ভাঙল নতুন বিয়ে, শুরু ব্ল্যাকমেইলের পৈশাচিক খেলা

দীর্ঘদিন ধরে ধোঁকায় থাকার পর তরুণী যখন জীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর কথা ভাবেন এবং অন্য এক পাত্রের সঙ্গে তার বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়, তখন ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে আসিফ। পুরনো কৌশলে সে তরুণীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালায়। তবে এবার সে সফল হয়নি। প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আসিফ তরুণীর হবু শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে তার আগের সন্তান থাকার বিষয়টি ফাঁস করে দেয়। শুধু তাই নয়, অতীতে আসিফের সঙ্গে কাটানো কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও কৌশলে ছড়িয়ে দিয়ে বিয়ের ঠিক ৯ দিন আগে সেই আয়োজন ভেঙে দেয় সে।

মানসিকভাবে ভেঙে পড়া তরুণীকে এরপর আবারও ‘ভালোবাসা ও সুন্দর সংসার’ দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাসে নিজের জালে ফেরান আসিফ। আর তখনই তার মাথায় আসে আরও ভয়ংকর ও পৈশাচিক এক পরিকল্পনা।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বাচ্চার মা হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিলাসবহুল হোটেলে তাকে নিয়ে যেত আসিফ। সেখানে সুকৌশলে তরুণীর অজান্তেই আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিওগুলো বিভিন্ন বিদেশি পর্নোগ্রাফি ও নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে বিক্রি করা শুরু করে সে। প্রায় শতাধিক ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে বিক্রির এক অসুস্থ নেশায় মেতে ওঠে এই যুবক।

নতুন বিয়ে ও লুকোচুরি

গত ১৬ আগস্টও ওই তরুণীর সঙ্গে বাসায় রাত কাটায় আসিফ। কিন্তু এর পরদিনই, অর্থাৎ ১৭ আগস্ট নগরীর বহদ্দারহাট ফরিদার পাড়া এলাকায় নিজের ৬ বছরের কন্যাসন্তান ও আগের সমস্ত সম্পর্কের কথা সম্পূর্ণ গোপন করে সম্পূর্ণ নতুন এক তরুণীকে বিয়ে করে সে।

এই খবর পাওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে আকাশ ভেঙে পড়ে প্রথম ভুক্তভোগীর মাথায়। তিনি ছুটে যান আসিফের আগ্রাবাদ মৌলবি পাড়া বিউটি ম্যানশন সংলগ্ন বাড়িতে। কিন্তু আসিফ সাফ জানিয়ে দেয়, সে কাউকে বিয়ে করেনি এবং তরুণীকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। নিজের ও সন্তানের অধিকারের কথা তুললে আসিফ এবার হাতে নেয় তার পুরোনো অস্ত্র—গোপনে ধারণ করা আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি।

আইনের মুখোমুখি আসিফ, বর্তমানে পলাতক

কোণঠাসা ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া তরুণী শেষ পর্যন্ত স্থানীয় থানা এবং আদালতে আইনি পদক্ষেপ নেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন সিএমপির বন্দর থানাকে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন এস আই স্বর্ণালী মজুমদার।  বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই আসিফ বর্তমানে পলাতক রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে আসিফের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা বন্দর থানা পুলিশ, একটি পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং আরেকটি সিআইডির নিবিড় তদন্তাধীন রয়েছে।

একজন নারীর সরলতা ও বিশ্বাসের চরম অপব্যবহার করে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং পর্নোগ্রাফি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কাওছার আজীম আসিফকে গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম বর্তমানে অভিযান চালাচ্ছে। তবে ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে থাকায় অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।