ঢাকা ০৮:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

সড়ক যেন মরণফাঁদ

দুর্ঘটনায় প্রাণহানির কারণে দেশের সড়কগুলো পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবার সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেলছে তাদের প্রিয়জনকে। গত শুক্রবার সিলেট ও বগুড়ায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। দুর্ঘটনার পর তদন্ত, মামলা, সাময়িক অভিযান, সবই হচ্ছে, কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না। ফলে একের পর এক প্রাণহানি ঘটেই চলেছে।সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গত এক দশকে নেওয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। নতুন আইন হয়েছে, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে, চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যানবাহনের ফিটনেস ও লাইসেন্স ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা হয়েছে, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামেনি। বরং দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের গত ছয় মাসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ৬ হাজার ৭৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৮৮৪ জন নিহত এবং ৭ হাজার ১৫৬ জন আহত হন। চলতি বছরের একই সময়ে দুর্ঘটনা হয়েছে ৫ হাজার ৭৫২টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৬৭৮ জন, আহত হয়েছেন ৭ হাজার ১৪৬ জন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩১টি দুর্ঘটনা এবং ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৯ জন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘বিপুল ব্যয়ে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। দুর্ঘটনা-পরবর্তী পদক্ষেপের পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমানোর ব্যবস্থাপনা নিয়েও কাজ করতে হবে। সড়কগুলোর উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ফিটনেসবিহীন গাড়িসহ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, দক্ষ চালক তৈরি করতে হবে। দুর্ঘটনার কারণগুলো নিয়ে কাজ করা বেশি জরুরি। সেজন্য পুলিশ, বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সবপক্ষকে সড়ক আইন বাস্তবায়নে আরও সক্রিয় ও সমন্বিত উপায়ে কাজ করতে হবে।’

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর এর কান্ট্রি কো-অডিনেটর ড. শরিফুল আলম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা বাংলাদেশের সড়কগুলোর কোনো ধরনের অডিট হয় না। সড়ক নিরাপদ করতে দরকার আইনি কাঠামো এবং বাধ্যবাধকতা। কিন্তু আমাদের কোনো আইন নেই, যেখানে প্রতিটি সড়কের জন্য এ ধরনের অডিট করার কথা বলা আছে। তাই আমাদের দাবি একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন। যেখানে নিয়মিতভাবে প্রতিটি সড়কে ‘রোড সেফটি অডিট’ হবে। সে অনুযায়ী সড়কগুলোর অবকাঠামোর পবিবর্তন আনা এবং সর্বাধিক নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।’

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামতে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতিকে চিহ্নিত করেছে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া অদক্ষ চালক ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন দায়ী। পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এখনো সড়কে চলছে। সড়ক পরিবহন আইন ও ট্রাফিক বিধি থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সর্বত্র সমান নয়। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, বিপজ্জনকভাবে লেন পরিবর্তন, উল্টো পথে চলাচল এসবের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় চালকদের মধ্যে আইন অমান্যের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। আঞ্চলিক সড়ক থেকে তিন চাকার ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, নছিমন, করিমন বিভিন্ন নামে পরিচিত ধীরগতির যানবাহন উঠে আসছে মহাসড়কে। ফলে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। অনেক সড়কে গর্ত, ভাঙাচোরা অংশ, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অপর্যাপ্ত ডিভাইডার রয়েছে। চালকের ক্লান্তিও বড় ঝুঁকি। দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম ও সেবা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এ ব্যাপারে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘হার্ট ফাউন্ডেশন এবং সিআইপিআরবি ও এর ২০২৩ সালের জরিপে দেখা যায় দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে রোডক্র্যাশ রোগীরা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। এ ধরনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে দুর্ঘটনার জন্য যে ধরনের সেবা প্রয়োজন সেগুলো একেবারই অপ্রতুল।’

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

সড়ক যেন মরণফাঁদ

আপডেট সময় : ১০:৪৩:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
দুর্ঘটনায় প্রাণহানির কারণে দেশের সড়কগুলো পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবার সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেলছে তাদের প্রিয়জনকে। গত শুক্রবার সিলেট ও বগুড়ায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। দুর্ঘটনার পর তদন্ত, মামলা, সাময়িক অভিযান, সবই হচ্ছে, কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না। ফলে একের পর এক প্রাণহানি ঘটেই চলেছে।সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গত এক দশকে নেওয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। নতুন আইন হয়েছে, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে, চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যানবাহনের ফিটনেস ও লাইসেন্স ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা হয়েছে, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামেনি। বরং দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের গত ছয় মাসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ৬ হাজার ৭৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৮৮৪ জন নিহত এবং ৭ হাজার ১৫৬ জন আহত হন। চলতি বছরের একই সময়ে দুর্ঘটনা হয়েছে ৫ হাজার ৭৫২টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৬৭৮ জন, আহত হয়েছেন ৭ হাজার ১৪৬ জন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩১টি দুর্ঘটনা এবং ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৯ জন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘বিপুল ব্যয়ে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। দুর্ঘটনা-পরবর্তী পদক্ষেপের পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমানোর ব্যবস্থাপনা নিয়েও কাজ করতে হবে। সড়কগুলোর উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ফিটনেসবিহীন গাড়িসহ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, দক্ষ চালক তৈরি করতে হবে। দুর্ঘটনার কারণগুলো নিয়ে কাজ করা বেশি জরুরি। সেজন্য পুলিশ, বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সবপক্ষকে সড়ক আইন বাস্তবায়নে আরও সক্রিয় ও সমন্বিত উপায়ে কাজ করতে হবে।’

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর এর কান্ট্রি কো-অডিনেটর ড. শরিফুল আলম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা বাংলাদেশের সড়কগুলোর কোনো ধরনের অডিট হয় না। সড়ক নিরাপদ করতে দরকার আইনি কাঠামো এবং বাধ্যবাধকতা। কিন্তু আমাদের কোনো আইন নেই, যেখানে প্রতিটি সড়কের জন্য এ ধরনের অডিট করার কথা বলা আছে। তাই আমাদের দাবি একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন। যেখানে নিয়মিতভাবে প্রতিটি সড়কে ‘রোড সেফটি অডিট’ হবে। সে অনুযায়ী সড়কগুলোর অবকাঠামোর পবিবর্তন আনা এবং সর্বাধিক নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।’

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামতে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ উঠে এসেছে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতিকে চিহ্নিত করেছে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া অদক্ষ চালক ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন দায়ী। পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এখনো সড়কে চলছে। সড়ক পরিবহন আইন ও ট্রাফিক বিধি থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সর্বত্র সমান নয়। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং, বিপজ্জনকভাবে লেন পরিবর্তন, উল্টো পথে চলাচল এসবের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় চালকদের মধ্যে আইন অমান্যের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। আঞ্চলিক সড়ক থেকে তিন চাকার ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, নছিমন, করিমন বিভিন্ন নামে পরিচিত ধীরগতির যানবাহন উঠে আসছে মহাসড়কে। ফলে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। অনেক সড়কে গর্ত, ভাঙাচোরা অংশ, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অপর্যাপ্ত ডিভাইডার রয়েছে। চালকের ক্লান্তিও বড় ঝুঁকি। দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রম ও সেবা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এ ব্যাপারে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘হার্ট ফাউন্ডেশন এবং সিআইপিআরবি ও এর ২০২৩ সালের জরিপে দেখা যায় দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে রোডক্র্যাশ রোগীরা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। এ ধরনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে দুর্ঘটনার জন্য যে ধরনের সেবা প্রয়োজন সেগুলো একেবারই অপ্রতুল।’