ঢাকা ১১:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩

চট্টগ্রামে এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ: ​হোটেল পেনিনসুলার বিলে মদ্যপানের প্রমাণ মেলেনি!

রাজনৈতিক পদ ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন দলেরই এক নারী কর্মী। অভিযুক্ত নেতার নাম এস এম সুজা উদ্দীন। তিনি এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। এই ঘটনায় সাদিয়া আফরিন নামের জাতীয় নারী শক্তির এক কেন্দ্রীয় নেত্রীকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

​গত বুধবার চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানায় এই জিডি করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ তদন্তে এনসিপির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

​এদিকে যে রেস্তোরাঁয় ঘটনাটি ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেখানকার বিলের কপিতে কোনো মদ বা মাদকদ্রব্যের হদিস মেলেনি।

​ভুক্তভোগী নারী এনসিপির একজন সক্রিয় কর্মী এবং চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানার সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। গত শুক্রবার নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন।

​সংবাদ সম্মেলনে ওই নারী কর্মী অভিযোগ করেন, দলের নেত্রী সাদিয়া আফরিন সাংগঠনিক বৈঠকের কথা বলে গত ১৭ জুন (বুধবার) তাকে জিইসি মোড়ের হোটেল পেনিনসুলার ‘ওজন বার অ্যান্ড লাউঞ্জে’ ডেকে নেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, সাদিয়া ছাড়া অন্য কোনো নারী উপস্থিত ছিলেন না।

​অভিযোগকারীর দাবি, সেখানে সাংগঠনিক কোনো আলোচনা না করে তাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পদ, চাকরি ও ব্যবসায়িক সুবিধার প্রলোভন দেওয়া হয়। একপর্যায়ে উপস্থিত ব্যক্তিরা ধূমপান করেন এবং তাকেও ধূমপান ও মদ পানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিছু সময় পর সাদিয়া আফরিন চলে গেলে তিনি সেখানে কয়েকজন পুরুষের মাঝে একা হয়ে পড়েন।

​লিখিত অভিযোগে ওই নারী বলেন, ‘সেখানে এস এম সুজা উদ্দীন আমার সঙ্গে মুখে ও ইশারা-ইঙ্গিতে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং যৌন হয়রানিমূলক অঙ্গভঙ্গি করেন। প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় একপর্যায়ে আমাকে “ডিল অর ডেথ” ধরনের হুমকিও দেওয়া হয়।’

​অভিযোগে মদ্যপানের প্রস্তাবের বিষয়টি উল্লেখ থাকায় ঘটনাস্থল হোটেল পেনিনসুলার ওজন লাউঞ্জের ওই দিনের বিলের তথ্য অনুসন্ধান করা হয়েছে।
​সেখানকার বিলের কপিতে দেখা যায়, ওই দিন টেবিলে পরিবেশন করা হয়েছিল, এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট, চারটি মাটন পায়া, চারটি গার্লিক নান, দুটি চিকেন প্রন, একটি মিনারেল ওয়াটার, একটি বানানা স্মুদি, চার কাপ কফি এবং একটি ক্লাসিক কোক। ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জসহ মোট বিল এসেছিল ৮ হাজার ৩১৬ টাকা। সংগৃহীত বিলের কপিতে কোনো ধরনের অ্যালকোহলিক পানীয় বা মাদকজাতীয় দ্রব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। তবে বিলের বাইরে অন্য কিছু পরিবেশন করা হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

​চকবাজার থানায় করা জিডিতে অভিযোগকারী নারীর কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া জিডিতে দেওয়া তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটির নিবন্ধন তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, নম্বরটি ওই নারীর নামে নিবন্ধিত নয়; এটি অন্য এক পুরুষের নামে নিবন্ধিত। তবে ওই নারী দাবি করেছেন, নম্বরটি তাঁর নামেই নিবন্ধিত।

​অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দীন বলেন, ‘এ বিষয়ে দলের সাংগঠনিক তদন্ত চলমান। আমি নিজেও সাংগঠনিক দায়িত্বে আছি। সেই জায়গা থেকে দলের নির্দেশনা না আসা অবধি এ বিষয়ে আমার কথা না বলাটাই শ্রেয়। তদন্ত শেষে আমি আমার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেব।’

​চকবাজার থানার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মেহেদী হাসান সৈকত বলেন, ‘জিডি হওয়ার পর তদন্ত করার জন্য আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হয়। আমরা অনুমতির জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু এখনো তা আসেনি। আদালতের অনুমতি পাওয়ার আগে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।’

​এদিকে কেন্দ্রীয় তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্ত সুজা উদ্দীনের পক্ষে সাফাই গেয়ে বিবৃতি দেওয়ায় চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর শোয়েব ও সদস্য-সচিব আরিফ মঈনুদ্দিনকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি। গত ১৮ জুন দেওয়া ওই নোটিশে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

​এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্য-সচিব আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, ‘এই ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছিল। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, অভিযোগকারীর বিবরণের সত্যতা নেই। তাই দলের ইমেজ রক্ষায় আমরা বিবৃতি দিয়েছিলাম। কেন্দ্র থেকে শোকজ করা হয়েছে, আমরা যথাসময়ে এর জবাব দেব।’

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ইউসিটিসিতে “OBE for Academic Excellence” শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

চট্টগ্রামে এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ: ​হোটেল পেনিনসুলার বিলে মদ্যপানের প্রমাণ মেলেনি!

আপডেট সময় : ০২:৫৯:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

রাজনৈতিক পদ ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন দলেরই এক নারী কর্মী। অভিযুক্ত নেতার নাম এস এম সুজা উদ্দীন। তিনি এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। এই ঘটনায় সাদিয়া আফরিন নামের জাতীয় নারী শক্তির এক কেন্দ্রীয় নেত্রীকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

​গত বুধবার চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানায় এই জিডি করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ তদন্তে এনসিপির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

​এদিকে যে রেস্তোরাঁয় ঘটনাটি ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেখানকার বিলের কপিতে কোনো মদ বা মাদকদ্রব্যের হদিস মেলেনি।

​ভুক্তভোগী নারী এনসিপির একজন সক্রিয় কর্মী এবং চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানার সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। গত শুক্রবার নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন।

​সংবাদ সম্মেলনে ওই নারী কর্মী অভিযোগ করেন, দলের নেত্রী সাদিয়া আফরিন সাংগঠনিক বৈঠকের কথা বলে গত ১৭ জুন (বুধবার) তাকে জিইসি মোড়ের হোটেল পেনিনসুলার ‘ওজন বার অ্যান্ড লাউঞ্জে’ ডেকে নেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, সাদিয়া ছাড়া অন্য কোনো নারী উপস্থিত ছিলেন না।

​অভিযোগকারীর দাবি, সেখানে সাংগঠনিক কোনো আলোচনা না করে তাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পদ, চাকরি ও ব্যবসায়িক সুবিধার প্রলোভন দেওয়া হয়। একপর্যায়ে উপস্থিত ব্যক্তিরা ধূমপান করেন এবং তাকেও ধূমপান ও মদ পানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিছু সময় পর সাদিয়া আফরিন চলে গেলে তিনি সেখানে কয়েকজন পুরুষের মাঝে একা হয়ে পড়েন।

​লিখিত অভিযোগে ওই নারী বলেন, ‘সেখানে এস এম সুজা উদ্দীন আমার সঙ্গে মুখে ও ইশারা-ইঙ্গিতে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং যৌন হয়রানিমূলক অঙ্গভঙ্গি করেন। প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় একপর্যায়ে আমাকে “ডিল অর ডেথ” ধরনের হুমকিও দেওয়া হয়।’

​অভিযোগে মদ্যপানের প্রস্তাবের বিষয়টি উল্লেখ থাকায় ঘটনাস্থল হোটেল পেনিনসুলার ওজন লাউঞ্জের ওই দিনের বিলের তথ্য অনুসন্ধান করা হয়েছে।
​সেখানকার বিলের কপিতে দেখা যায়, ওই দিন টেবিলে পরিবেশন করা হয়েছিল, এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট, চারটি মাটন পায়া, চারটি গার্লিক নান, দুটি চিকেন প্রন, একটি মিনারেল ওয়াটার, একটি বানানা স্মুদি, চার কাপ কফি এবং একটি ক্লাসিক কোক। ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জসহ মোট বিল এসেছিল ৮ হাজার ৩১৬ টাকা। সংগৃহীত বিলের কপিতে কোনো ধরনের অ্যালকোহলিক পানীয় বা মাদকজাতীয় দ্রব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। তবে বিলের বাইরে অন্য কিছু পরিবেশন করা হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

​চকবাজার থানায় করা জিডিতে অভিযোগকারী নারীর কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া জিডিতে দেওয়া তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটির নিবন্ধন তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, নম্বরটি ওই নারীর নামে নিবন্ধিত নয়; এটি অন্য এক পুরুষের নামে নিবন্ধিত। তবে ওই নারী দাবি করেছেন, নম্বরটি তাঁর নামেই নিবন্ধিত।

​অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দীন বলেন, ‘এ বিষয়ে দলের সাংগঠনিক তদন্ত চলমান। আমি নিজেও সাংগঠনিক দায়িত্বে আছি। সেই জায়গা থেকে দলের নির্দেশনা না আসা অবধি এ বিষয়ে আমার কথা না বলাটাই শ্রেয়। তদন্ত শেষে আমি আমার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেব।’

​চকবাজার থানার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মেহেদী হাসান সৈকত বলেন, ‘জিডি হওয়ার পর তদন্ত করার জন্য আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হয়। আমরা অনুমতির জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু এখনো তা আসেনি। আদালতের অনুমতি পাওয়ার আগে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।’

​এদিকে কেন্দ্রীয় তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্ত সুজা উদ্দীনের পক্ষে সাফাই গেয়ে বিবৃতি দেওয়ায় চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর শোয়েব ও সদস্য-সচিব আরিফ মঈনুদ্দিনকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি। গত ১৮ জুন দেওয়া ওই নোটিশে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

​এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্য-সচিব আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, ‘এই ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছিল। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, অভিযোগকারীর বিবরণের সত্যতা নেই। তাই দলের ইমেজ রক্ষায় আমরা বিবৃতি দিয়েছিলাম। কেন্দ্র থেকে শোকজ করা হয়েছে, আমরা যথাসময়ে এর জবাব দেব।’