ঢাকা ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

হুন্ডি ও অর্থ পাচারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মূল হোতা খালেদ এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে!

চট্টগ্রামের বাসিন্দা মো. খালেদ হোসেনের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অর্থ বিদেশে পাচারে সহযোগিতার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার নামে ও বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক হিসাব, উচ্চমূল্যের যানবাহন এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ রয়েছে।

জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) স্থায়ী ঠিকানা লেখা চট্টগ্রামের চকবাজারের চন্দনপুরা এলাকায়। কিন্তু ব্যাংকের নথিতে দেখা যাচ্ছে তিনি থাকছেন লালখান বাজারের এক বিলাসবহুল টাওয়ারে। শুধু ঠিকানা নয়, জন্মতারিখ নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা এই মো. খালেদ হোসেনের বিরুদ্ধে এখন উঠেছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, হুন্ডি ব্যবসা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অর্থ বিদেশে পাচারে সহযোগিতার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

​অভিযোগের তীর মূলত তার নামে-বেনামে থাকা একাধিক ব্যাংক হিসাব, গ্যারেজে থাকা উচ্চমূল্যের যানবাহন এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদের দিকে, যার আয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদকের হাতে আসা অভিযোগে দেখা যায়, খালেদ হোসেনের নামে দুটি বিলাসবহুল জিপ গাড়ি নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি ২০২২ মডেলের মার্সিডিজ-বেঞ্জ (ঢাকা মেট্রো-গ-২১-৯২৫০)। নথিতে দাবি করা হয়েছে, একটি তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে গাড়িটি তার নামে কেনা হয়। তবে

অভিযোগকারীর ভাষ্য মতে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের তথ্যের সঙ্গে এই দাবির বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পোশাক কারখানার গাড়ি কীভাবে একজন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত হলো তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। এছাড়া ২০২৫ মডেলের আরেকটি জিপ গাড়িও (চট্টমেট্রো-গ-১১-৭১৬০) তিনি নিয়মিত চট্টগ্রামে ব্যবহার করছেন।

​স্থাবর সম্পদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ডাঙ্গাচর মৌজার জুলধা ইউনিয়নে খালেদ হোসেনের নামে প্রায় ৩২০ শতক বা ৮ কানি জমি ছিল। ২০২৩ সালে এই জমিটি তিনি প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এত বিপুল পরিমাণ টাকার স্থাবর সম্পদের মূল উৎস কী ছিল এবং এই লেনদেনের অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আদান-প্রদান হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা হয়েছে।

​খালেদ হোসেনের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক হিসাব পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) লিমিটেডের দামপাড়া শাখায় তিনি একজন ‘প্রিমিয়াম প্রাইওরিটি’ বা ভিআইপি গ্রাহক। এছাড়া সিটি ব্যাংক ও ওয়ান ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও তার নামে মোটা অঙ্কের লেনদেনের একাধিক হিসাব রয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, তার বার্ষিক আয়কর রিটার্নে এই প্রকৃত আয় ও অর্জিত সম্পদের কোনো সঠিক তথ্য প্রতিফলিত হয়নি।

​সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে হুন্ডি ও ক্যাপিটাল ফ্লাইট (অর্থ পাচার) নিয়ে। দেশের কয়েকজন প্রভাবশালী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীর কালো টাকা বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে গিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধ অর্থ লেনদেনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটও তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য গেছে।

​অভিযোগকারীরা বলছেন, মো. খালেদ হোসেনের এই অবৈধ সম্পদ ও কর্মকাণ্ডের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে পুরো সিন্ডিকেটের নাম বেরিয়ে আসবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

১২ বছরেই শতকোটির মালিক; চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মকর্তা আলতাফের ‘আলাদিনের চেরাগ’

হুন্ডি ও অর্থ পাচারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মূল হোতা খালেদ এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে!

আপডেট সময় : ১২:৩০:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামের বাসিন্দা মো. খালেদ হোসেনের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অর্থ বিদেশে পাচারে সহযোগিতার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার নামে ও বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক হিসাব, উচ্চমূল্যের যানবাহন এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ রয়েছে।

জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) স্থায়ী ঠিকানা লেখা চট্টগ্রামের চকবাজারের চন্দনপুরা এলাকায়। কিন্তু ব্যাংকের নথিতে দেখা যাচ্ছে তিনি থাকছেন লালখান বাজারের এক বিলাসবহুল টাওয়ারে। শুধু ঠিকানা নয়, জন্মতারিখ নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা এই মো. খালেদ হোসেনের বিরুদ্ধে এখন উঠেছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, হুন্ডি ব্যবসা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অর্থ বিদেশে পাচারে সহযোগিতার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

​অভিযোগের তীর মূলত তার নামে-বেনামে থাকা একাধিক ব্যাংক হিসাব, গ্যারেজে থাকা উচ্চমূল্যের যানবাহন এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদের দিকে, যার আয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদকের হাতে আসা অভিযোগে দেখা যায়, খালেদ হোসেনের নামে দুটি বিলাসবহুল জিপ গাড়ি নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি ২০২২ মডেলের মার্সিডিজ-বেঞ্জ (ঢাকা মেট্রো-গ-২১-৯২৫০)। নথিতে দাবি করা হয়েছে, একটি তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে গাড়িটি তার নামে কেনা হয়। তবে

অভিযোগকারীর ভাষ্য মতে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের তথ্যের সঙ্গে এই দাবির বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পোশাক কারখানার গাড়ি কীভাবে একজন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত হলো তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। এছাড়া ২০২৫ মডেলের আরেকটি জিপ গাড়িও (চট্টমেট্রো-গ-১১-৭১৬০) তিনি নিয়মিত চট্টগ্রামে ব্যবহার করছেন।

​স্থাবর সম্পদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ডাঙ্গাচর মৌজার জুলধা ইউনিয়নে খালেদ হোসেনের নামে প্রায় ৩২০ শতক বা ৮ কানি জমি ছিল। ২০২৩ সালে এই জমিটি তিনি প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এত বিপুল পরিমাণ টাকার স্থাবর সম্পদের মূল উৎস কী ছিল এবং এই লেনদেনের অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আদান-প্রদান হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা হয়েছে।

​খালেদ হোসেনের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক হিসাব পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) লিমিটেডের দামপাড়া শাখায় তিনি একজন ‘প্রিমিয়াম প্রাইওরিটি’ বা ভিআইপি গ্রাহক। এছাড়া সিটি ব্যাংক ও ওয়ান ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও তার নামে মোটা অঙ্কের লেনদেনের একাধিক হিসাব রয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, তার বার্ষিক আয়কর রিটার্নে এই প্রকৃত আয় ও অর্জিত সম্পদের কোনো সঠিক তথ্য প্রতিফলিত হয়নি।

​সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে হুন্ডি ও ক্যাপিটাল ফ্লাইট (অর্থ পাচার) নিয়ে। দেশের কয়েকজন প্রভাবশালী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীর কালো টাকা বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে গিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধ অর্থ লেনদেনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটও তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য গেছে।

​অভিযোগকারীরা বলছেন, মো. খালেদ হোসেনের এই অবৈধ সম্পদ ও কর্মকাণ্ডের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে পুরো সিন্ডিকেটের নাম বেরিয়ে আসবে।