
রহমান সাকিব, চট্টগ্রাম: রপ্তানি আদেশের পণ্য বাতিল বা পরিবর্তনের চটজলদি অজুহাত। এরপর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের হাজার হাজার শীতের ভেস্ট জ্যাকেট ও জিন্স প্যান্ট মজুদ করে খোলা বাজারে বিক্রি তাদের মূল উদ্দেশ্য। চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওয়াপদা গেইট, কুলগাঁও এলাকায় অবস্থিত গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান জিন্সমিথ লিমিটেড (Jeansmith Limited) বিপুল পরিমাণ কাপড়ের রোল মজুত এবং রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা পণ্য অর্ডার বাতিলের অজুহাতে দেশের বাজারে পাচার করা উদ্দেশ্য নিয়ে বিপুল পরিমাণ শীতের জামা ভেস্ট,ও জিন্স পেন্ট তার নিজের বাসায় মজুদের সত্যতা পাওয়া গেছে।
গোপন সংবাদের ভিক্তিতে চট্টগ্রাম কাষ্টমস বন্ড কমিশনারেট
অভিযান চালিয়ে নগরীর রহমাননগর আবাসিক এলাকায় বি ব্লকের বাসায় এসকল মালামাল জব্দ করেন।
জানাযায়, প্রতিষ্ঠানটির মালিক নোয়াফেল বিন রেজা দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমসের অনুমোদিত বা ঘোষিত বন্ডেড ওয়্যারহাউজে পণ্য না রেখে কাস্টমসের চোখ এড়িয়ে আবাসিক ভবনে কমার্শিয়াল পণ্য মজুদ রাখতেন মূলত শুল্ক বা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই নিয়ে এবং বন্ড সুবিধার (Duty-Free) কাপড়ের রোল এনে মূলত তা তিনি চট্টগ্রাম ছোট পোশাক কারখানা এবং খোলা বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি করতেন।
চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের একটি বিশেষ টিম গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগরের রহমাননগর আবাসিক এলাকার বি ব্লকের একটি আবাসিক ভবনে আকস্মিক এই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে ওই বাসা থেকে ৩৩২ পিস কাপড়ের রোল, ১১ হাজার পিস শীতের ভেস্ট জ্যাকেট (১১৫৭ কার্টুন) এবং ৩৩২ কার্টুন জিন্স প্যান্ট জব্দ করা হয়।
অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুলগাঁও এলাকায় অবস্থিত তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘জিন্সমিথ লিমিটেড’ (Jeansmith Limited)-এর স্বত্বাধিকারী নোয়াফেল বিন রেজা দীর্ঘদিন ধরে এই জালিয়াতি চালিয়ে আসছিলেন। বন্ড সুবিধার (Duty-Free) আওতায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত কাপড়ের রোল ও কাঁচামাল নিয়ম অনুযায়ী কারখানায় না নিয়ে সোজা কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে আবাসিক এলাকায় তার নিজস্ব বাসায় এনে স্তূপ করে রাখতেন। পরবর্তী সময়ে এসব কাঁচামাল ও তৈরি পোশাক স্থানীয় ছোট কারখানা এবং খোলা বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি করা হতো।
আইন লঙ্ঘন ও কঠোর শাস্তির মুখে :
সংশ্লিষ্টদের মতে, কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত বা বন্ড সুবিধার আওতায় আনা পণ্য কেবল সরকার নির্ধারিত বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওয়্যারহাউজে রাখার কঠোর বিধান রয়েছে। নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করে এ ধরনের কমার্শিয়াল পণ্য আবাসিক এলাকায় লুকিয়ে রাখা গুরুতর ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
বন্ড নীতিমালা অনুযায়ী, আমদানিকৃত কাঁচামাল সরাসরি অনুমোদিত ফ্যাক্টরিতে যাওয়ার কথা। এই শর্ত ভঙ্গের কারণে জিন্সমিথ লিমিটেডের বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিলসহ কঠোর আইনি শান্তির বিধান হয়েছে। আইন অনুযায়ী, শুল্ক ফাঁকি এবং চোরাই বা অবৈধ মাল নিজের কাছে রাখার কারণে অর্থদণ্ডসহ ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ (BGMEA) থেকেও প্রতিষ্ঠানটির সদস্যপদ বাতিলের নিয়ম রয়েছে ।
ঝুঁকিতে দেশের ভাবমূর্তি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন:
অর্থনীতিবিদ ও তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জিন্সমিথের এই অপকর্মের খেসারত দিতে হতে পারে গোটা দেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্র্যান্ড বা বায়াররা যখন দেখেন তাদের নিজস্ব ডিজাইন ও এক্সক্লুসিভ কালেকশনের পোশাক নির্ধারিত মূল্যে রপ্তানি হওয়ার আগেই বাংলাদেশের খোলা বাজারে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তখন তারা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন। কপিরাইট লঙ্ঘন ও সিকিউরিটি ব্রিচের অভিযোগে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতকে কালো তালিকাভুক্ত করার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর বিরূপ প্রভাবে দেশের বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কাস্টমস কমিশনারেট সূত্র জানিয়েছে, জব্দকৃত পণ্যের সঠিক বাজারমূল্য এবং এ পর্যন্ত কী পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে তা নির্ধারণে ইনভেন্টরি ও অডিট কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে এই চক্রের অন্য কোনো হোতা বা প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি জোরালো তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 
















