ঢাকা ০২:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২

কালিয়াকৈরে ভুল চিকিৎসায় দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালে প্রসূতির মৃত্যু

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে এক তরুণ প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলার বাইপাস এলাকায় অবস্থিত দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর পিংকি মালো (১৭) নামের এক তরুণীর মৃত্যু ঘটে।

এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।নিহত পিংকি মালো কালিয়াকৈর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের দক্ষিণ-পূর্ব মাঝিপাড়ার পিন্টু মালোর মেয়ে এবং একই ইউনিয়নের রঘুনাথপুর মধ্যপাড়ার বাবু মালোর ছেলে সজীব মালোর স্ত্রী। তাদের বিয়ের বয়স মাত্র এক বছর।পরিবারের অভিযোগ, পিংকিকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও কোনো প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়।

অপারেশনের কিছু সময় পর নবজাতককে জীবিত অবস্থায় বের করা হলেও পরে প্রসূতিকে মৃত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

প্রসূতির মা অভিযোগ করে বলেন, আমার মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় সিজারের জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তারা কোনো পরীক্ষা ছাড়াই অপারেশন করে। কিছুক্ষণ পর নার্স নবজাতককে নিয়ে বাইরে আসে ও বকশিশ চান। পরে মেয়েকে বের করলে দেখি ঠোঁট কালো, শরীর ঠান্ডা। জানতে চাইলে তারা বলে ‘ঠান্ডার ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে । তখনই বুঝে যাই আমার মেয়ে মারা গেছে।

নিহতের দাদা গোবিন্দ মালো বলেন, আমার নাতিনকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি চাই।”স্বামী সজীব মালো বলেন, ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণেই আমার স্ত্রী মারা গেছে। আমি প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চাই।

শ্বশুর বাবু মাল জানান, অপারেশনের পর ডাক্তাররা বলেন ঠান্ডার ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পিংকির মুখ কালো হয়ে যাচ্ছিল। পরে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা জানান, সে অনেক আগেই মারা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে। অভিজ্ঞ ডাক্তার না থাকলেও তারা বড় বড় অপারেশন করে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”আরেক স্থানীয় নারী জাহানারা বেগম বলেন, এই হাসপাতালে বহুদিন ধরে অব্যবস্থাপনা চলছে। রোগীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এখন এক তরুণী মারা গেলেন এটা মেনে নেওয়া যায় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নই। তবে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাদিয়া মুনমুন বলেন, জেলা সিভিল সার্জনের নির্দেশনা পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাওছার আহমেদ বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে জেলা সমন্বয় সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করবো এবং জেলা সিভিল সার্জনের সঙ্গে সমন্বয় করে লাইসেন্সবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আমিনুল দেওয়ান এর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, তবে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টাও করা হয়, কিন্তু তার কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।নিহতের পরিবার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছে।স্থানীয়রা বলেন, কালিয়াকৈরে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে লাইসেন্সবিহীনভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। এ ধরনের অব্যবস্থাপনা বন্ধে এখনই প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

২০২৬ সালের রমজান ও ঈদের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা

কালিয়াকৈরে ভুল চিকিৎসায় দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালে প্রসূতির মৃত্যু

আপডেট সময় : ১১:২৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে এক তরুণ প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলার বাইপাস এলাকায় অবস্থিত দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর পিংকি মালো (১৭) নামের এক তরুণীর মৃত্যু ঘটে।

এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।নিহত পিংকি মালো কালিয়াকৈর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের দক্ষিণ-পূর্ব মাঝিপাড়ার পিন্টু মালোর মেয়ে এবং একই ইউনিয়নের রঘুনাথপুর মধ্যপাড়ার বাবু মালোর ছেলে সজীব মালোর স্ত্রী। তাদের বিয়ের বয়স মাত্র এক বছর।পরিবারের অভিযোগ, পিংকিকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও কোনো প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়।

অপারেশনের কিছু সময় পর নবজাতককে জীবিত অবস্থায় বের করা হলেও পরে প্রসূতিকে মৃত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

প্রসূতির মা অভিযোগ করে বলেন, আমার মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় সিজারের জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তারা কোনো পরীক্ষা ছাড়াই অপারেশন করে। কিছুক্ষণ পর নার্স নবজাতককে নিয়ে বাইরে আসে ও বকশিশ চান। পরে মেয়েকে বের করলে দেখি ঠোঁট কালো, শরীর ঠান্ডা। জানতে চাইলে তারা বলে ‘ঠান্ডার ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে । তখনই বুঝে যাই আমার মেয়ে মারা গেছে।

নিহতের দাদা গোবিন্দ মালো বলেন, আমার নাতিনকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি চাই।”স্বামী সজীব মালো বলেন, ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণেই আমার স্ত্রী মারা গেছে। আমি প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চাই।

শ্বশুর বাবু মাল জানান, অপারেশনের পর ডাক্তাররা বলেন ঠান্ডার ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পিংকির মুখ কালো হয়ে যাচ্ছিল। পরে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা জানান, সে অনেক আগেই মারা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে। অভিজ্ঞ ডাক্তার না থাকলেও তারা বড় বড় অপারেশন করে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।”আরেক স্থানীয় নারী জাহানারা বেগম বলেন, এই হাসপাতালে বহুদিন ধরে অব্যবস্থাপনা চলছে। রোগীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এখন এক তরুণী মারা গেলেন এটা মেনে নেওয়া যায় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নই। তবে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাদিয়া মুনমুন বলেন, জেলা সিভিল সার্জনের নির্দেশনা পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাওছার আহমেদ বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে জেলা সমন্বয় সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করবো এবং জেলা সিভিল সার্জনের সঙ্গে সমন্বয় করে লাইসেন্সবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আমিনুল দেওয়ান এর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, তবে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টাও করা হয়, কিন্তু তার কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।নিহতের পরিবার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছে।স্থানীয়রা বলেন, কালিয়াকৈরে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে লাইসেন্সবিহীনভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। এ ধরনের অব্যবস্থাপনা বন্ধে এখনই প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।