ঢাকা ০১:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২

চট্টগ্রামে ফিনলে প্রপার্টির নির্মাণাধীন ভবনে থামছে না মৃত্যুর মিছিল

◑ এক বছরে ২০–২২ শ্রমিকের মৃত্যু, চার মাসেই দ্বিতীয় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

◑ নিরাপত্তাহীন নির্মাণে পথচারীর জীবন সংকটে, গ্রেপ্তারের দাবি শ্রমিক ইউনিয়নের।

◑ জুলাই যোদ্ধা মৃত্যুর চার মাসের মাথায় আরেকজন মৃত্যুর পথযাত্রী।

আকাশছোঁয়া ভবনের শহর চট্টগ্রাম। দূরবিন কিংবা পাখির চোখে তাকালেই চোখে পড়ে একের পর এক বহুতল স্থাপনা। উন্নয়নের এই চিত্রের আড়ালেই যেন লুকিয়ে আছে মৃত্যুর নির্মম গল্প। বিশেষ করে রিহ্যাবভুক্ত আবাসন প্রতিষ্ঠান ফিনলে প্রপার্টিজ লিমিটেড–এর নির্মাণাধীন ভবনগুলো যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। চট্টগ্রামের রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (রিহ্যাব) আওতাধীন যেসব আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান জড়িত, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজই করে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষ। তবে বেশি কাজ করলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও শেষ নেই। গেল পাঁচ বছরেই প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন ভবনে নিরাপত্তাজনিত কারণে অন্তত ২০ থেকে ২২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন। ঠিকাদার ইব্রাহিম ও অশোক চৌধুরীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করার দাবি তাদের। না হলে চট্টগ্রাম শহরে কঠোর অন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।

প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে যেসব শ্রমিক কাজ করেন, তাদের বেশিরভাগকেই দেওয়া হয় না নিরাপত্তা সামগ্রী। ফলে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয় শ্রমিক-কর্মচারীদের। এত মৃত্যুর পরও উদাসিন ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষ, সবকিছুই ম্যানেজ করতে চান টাকা উড়িয়ে। গেল ২৭ সেপ্টেম্বর বেলা সোয়া ১২টায় নগরের চকবাজারের প্যারেড ময়দানের পাশে তাদের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান জুলাই যোদ্ধা  জাহাঙ্গীর আলম (২৬)। তার মৃত্যুর চার মাস না পেরুতেই এবার নির্মাণাধীন ভবন থেকে রড পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন হাসান মির্জা (৫০) নামে এক পথচারী। এখন তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন হাসপাতালের বিছানায়। তবে এসব ঘটনায় বিন্দুমাত্র অনুশোচনাও নেই ফিনলে প্রপার্টির। তাদের দাবি, যেই আহত হোক না কেন, প্রতিষ্ঠানের একটি টিম বিষয়টি ম্যানেজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আবাসন খাতে মানুষের মৃত্যু বা আহত হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়।

এদিকে এসব ঘটনায় উদ্বেগ বাড়লেও পেটের তাগিদেই আতঙ্ক নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে শ্রমিকদের একাংশ। তাদের জানান, প্রশাসনের আসকারায় এসব ঘটনার বিচার না হওয়াতেই হত্যাকাণ্ড দিনদিন বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত রোববার (৪ জানুয়ারি) বেলা ১২টায় নগরের মুরাদপুর এলাকায় ফিনলে প্রোপার্টিজ লিমিটেডের অধীনে নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলাকালে উপর থেকে লোহার রড মাথায় পড়ে গুরুতর আহত হন হাসান মির্জা (৫০) নামে এক পথচারী। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন স্থানীয়রা। বর্তমানে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

ওই ভবনের এক শ্রমিক নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক থাকা শর্তেও বলেন, মূলত নির্মাণ কাজ চলাকালে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি ব্যবহার না করায় এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়, সামান্য কিছু টাকা খরচ করে তারা নিরাপত্তা বেস্টুনি তৈরি করে না। পাশাপাশি শ্রমিকদের দেওয়া হয় না কোন নিরাপত্তা সামগ্রী। ফলে না চাইলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যেক শ্রমিককে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

হাসপাতালে ভর্তি হাসান মির্জার স্বজনরা জানান, গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে রোববার তিনি মুরাদপুর দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎই তার মাথায় উপর থেকে রড এসে পড়ে। ঘটনাস্থলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে আমরাও আতঙ্কিত হয়ে যাই। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কেউ এগিয়ে না এলেও স্থানীয় ও পথচারীরা মিলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করান। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা এর বিচার দাবি করছি। আল্লাহ ক্ষমা করুক, যদি তার কিছু হয়-তাহলে আমরা ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবো।

এদিকে এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় নগরের কোতয়ালী থানায় একটি অভিযোগ করেন চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুর উদ্দিন সুমন। তিনি তার অভিযোগে বলেন, ফিনলে প্রোপার্টিজ লি. এর জিএম এবং ঠিকাদার ইব্রাহিম চট্টগ্রামসহ বিভিন্নস্থানে বেশ কয়েকটি নির্মাণ প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করে। উক্ত নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করাকালে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত ও আহত হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়াতে আলোচনা হইলে ফিনলে কর্তৃপক্ষ নড়ে চড়ে বসে। এমনকি আমি তাদের এসব বিষয়ে বেশ কয়েকবার সতর্ক করার পরেও তারা প্রকল্পের নির্মাণ কাজ চলাকালে শ্রমিকদের কোন প্রকার নিরাপত্তা সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা না করে অবহেলা করছে। তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবহেলার কারণে নির্মাণ শ্রমিকদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। গত ৪ জানুয়ারি দুপুর ১২টায় ফিনলে প্রোপার্টিজ লি. অধীনে মুরাদপুর এলাকায় নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলাকালে হাসান মির্জা (৫০) নামে এক পথচারী রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তার মাথার উপর লোহার রড পড়ায় তিনি গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে তাহাকে স্থানীয় ও পথচারী লোকজন উদ্ধার করে তাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুর উদ্দিন সুমন বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নেই, তাদের অধিকার নেই। আমরা ফিনলে প্রপার্টিজের মালিকদের বারবার অবগত করি। আপনারা শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। তাদের এতবার করে বলার পরও তার কোন শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি। সেফটি নিরাপত্তা না দিয়ে তারা গত এক বছরে আমাদের ২০-২২ জন শ্রমিক অকালে মেরে ফেলে। গত পাঁচ বছরে এই সেফটি ইস্যুতেই আমার হাত দিয়ে অন্তত ৫০টি লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাল থেকে বের করেছি।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ঠিকাদার ইব্রাহিম ও অশোক চৌধুরীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। আর না হলে আমরা চট্টগ্রাম শহরে কঠোর অন্দোলন গড়ে তুলবো।

এদিকে এই বিষয়ে জানতে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের জেনারেল ম্যানেজার অশোককে বেশ কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তাই তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

ফিনলে প্রোপার্টিজ লি. অধীনে মুরাদপুর এলাকায় নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদার ইব্রাহিমকে কল দিলে তিনিও ফোন ধরেননি। তাই তারও বক্তব্য জানা যায়নি।

এদিকে এর আগে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বেলা সোয়া ১২টায় নগরের চকবাজার থানাধীন প্যারেড ময়দানের পাশে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের নির্মাণাধীন ইদ্রিস বিল্ডিংয়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে স্পৃষ্ট হয়ে মারা যান জুলাই যোদ্ধার না মো. জাহাঙ্গীর আলম (২৬)। তিনি কুমিল্লার চান্দিনা এলাকার বাসিন্দা। তবে তিনি চট্টগ্রামে থাকতেন পাহাড়তলী থানার ঝাউতলার ডিজেল কলোনিতে।

নিহত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী জানান, জুলাই গণঅভ্যূত্থানে তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম নিজের জীবন বাজি রেখে লড়েছিল। তবে কখনও কোন ক্রেডিট নিতে চাননি। কিন্তু ফিনলে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের অসাবধানতার বলি হতে হয়েছে তাকে। পরিবারে তিনিই কেমন উপার্যনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার এই মৃত্যুতে পরিবারটি এখন নিঃস্ব হয়ে গেল।

সেদিন দুপুরে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে আহত হওয়ার পর জাহাঙ্গিরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনেছিল মিজানুর রহমান নামে তার এক সহকর্মী। তিনি বলেন, আমরা নির্মাণাধীন ওই ভবনের নিচ তলায় ইলেক্ট্রিকের কাজ করছিলাম। খুবই সাবধানভাবে আমরা কাজ করছিলাম। কিন্তু আচমকা জাহাঙ্গির ভাই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যান। বিষয়টি বুঝার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশিক জানান, বেলা ১২টার পর জাহাঙ্গির আলম নামের এক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় চমেক হাসপাতালে আনা হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আবাসন প্রতিষ্ঠান ফিনলে প্রপার্টির ভবনে মৃত্যুর খবর নতুন নয়, ২০১৯ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের ঝাউতলা খুলশী কলোনি এলাকায় আবাসন প্রতিষ্ঠান ফিনলে প্রপার্টির একটি নির্মাণাধীন ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মো. মনির (২৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। মনির ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষণ থানার আলমগীর মাঝির ছেলে।

বাংলাদেশ নির্মাণ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সহসভাপতি কবির হোসেন জানান, ফিনলে প্রপার্টির কোন ভবনেই শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সরঞ্জাম দেওয়া হয় না। যে কারণে ঝুঁকি নিয়েই শ্রমিকরা কাজ করতে হয়। জাহাঙ্গিরের মৃত্যু স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, তাদের নিরাপত্তায় কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে।

ফিনলে প্রপার্টির জেনারেল ম্যানেজার (সেলস) আবদুল্লাহ আল ফারুক (জিয়াদ) বলেন, সেফটি নিশ্চিত করে আমরা অবশ্যই কাজ করি। মুরাদপুরের সিরাজ সেন্টারে সেফটি নিশ্চিত করার জন্য যেই শেডটি দেওয়া হয়, সেটা দেওয়ার মত অবস্থা আগামী মাসে তৈরি হবে। সেটা না দেওয়ার আগেই এই রডটা কিভাবে পড়লো তা বুঝতে পারছি না। উপরে তখন কেউ কাজও করছিল না। আহত হয়েছে তা ঠিক আছে, কিন্তু আমরা এটার সবকিছু দ্রুত আমরা দেখভাল করেছি। আমরা সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি, কিন্তু মাঝে মাঝে দুই একটা দুর্ঘটনা ঘটেই। এটা নিয়ে আমরা খুবই অনুতপ্ত। আমাদের কর্তৃপক্ষও এটি নিয়ে সজাগ আছে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে ফিনলে প্রপার্টির নির্মাণাধীন ভবনে থামছে না মৃত্যুর মিছিল

আপডেট সময় : ০৬:৫৪:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬

◑ এক বছরে ২০–২২ শ্রমিকের মৃত্যু, চার মাসেই দ্বিতীয় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

◑ নিরাপত্তাহীন নির্মাণে পথচারীর জীবন সংকটে, গ্রেপ্তারের দাবি শ্রমিক ইউনিয়নের।

◑ জুলাই যোদ্ধা মৃত্যুর চার মাসের মাথায় আরেকজন মৃত্যুর পথযাত্রী।

আকাশছোঁয়া ভবনের শহর চট্টগ্রাম। দূরবিন কিংবা পাখির চোখে তাকালেই চোখে পড়ে একের পর এক বহুতল স্থাপনা। উন্নয়নের এই চিত্রের আড়ালেই যেন লুকিয়ে আছে মৃত্যুর নির্মম গল্প। বিশেষ করে রিহ্যাবভুক্ত আবাসন প্রতিষ্ঠান ফিনলে প্রপার্টিজ লিমিটেড–এর নির্মাণাধীন ভবনগুলো যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। চট্টগ্রামের রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (রিহ্যাব) আওতাধীন যেসব আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান জড়িত, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজই করে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষ। তবে বেশি কাজ করলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও শেষ নেই। গেল পাঁচ বছরেই প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন ভবনে নিরাপত্তাজনিত কারণে অন্তত ২০ থেকে ২২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন। ঠিকাদার ইব্রাহিম ও অশোক চৌধুরীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করার দাবি তাদের। না হলে চট্টগ্রাম শহরে কঠোর অন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।

প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে যেসব শ্রমিক কাজ করেন, তাদের বেশিরভাগকেই দেওয়া হয় না নিরাপত্তা সামগ্রী। ফলে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয় শ্রমিক-কর্মচারীদের। এত মৃত্যুর পরও উদাসিন ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষ, সবকিছুই ম্যানেজ করতে চান টাকা উড়িয়ে। গেল ২৭ সেপ্টেম্বর বেলা সোয়া ১২টায় নগরের চকবাজারের প্যারেড ময়দানের পাশে তাদের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান জুলাই যোদ্ধা  জাহাঙ্গীর আলম (২৬)। তার মৃত্যুর চার মাস না পেরুতেই এবার নির্মাণাধীন ভবন থেকে রড পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন হাসান মির্জা (৫০) নামে এক পথচারী। এখন তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন হাসপাতালের বিছানায়। তবে এসব ঘটনায় বিন্দুমাত্র অনুশোচনাও নেই ফিনলে প্রপার্টির। তাদের দাবি, যেই আহত হোক না কেন, প্রতিষ্ঠানের একটি টিম বিষয়টি ম্যানেজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আবাসন খাতে মানুষের মৃত্যু বা আহত হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়।

এদিকে এসব ঘটনায় উদ্বেগ বাড়লেও পেটের তাগিদেই আতঙ্ক নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে শ্রমিকদের একাংশ। তাদের জানান, প্রশাসনের আসকারায় এসব ঘটনার বিচার না হওয়াতেই হত্যাকাণ্ড দিনদিন বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত রোববার (৪ জানুয়ারি) বেলা ১২টায় নগরের মুরাদপুর এলাকায় ফিনলে প্রোপার্টিজ লিমিটেডের অধীনে নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলাকালে উপর থেকে লোহার রড মাথায় পড়ে গুরুতর আহত হন হাসান মির্জা (৫০) নামে এক পথচারী। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন স্থানীয়রা। বর্তমানে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

ওই ভবনের এক শ্রমিক নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক থাকা শর্তেও বলেন, মূলত নির্মাণ কাজ চলাকালে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি ব্যবহার না করায় এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়, সামান্য কিছু টাকা খরচ করে তারা নিরাপত্তা বেস্টুনি তৈরি করে না। পাশাপাশি শ্রমিকদের দেওয়া হয় না কোন নিরাপত্তা সামগ্রী। ফলে না চাইলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যেক শ্রমিককে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

হাসপাতালে ভর্তি হাসান মির্জার স্বজনরা জানান, গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে রোববার তিনি মুরাদপুর দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎই তার মাথায় উপর থেকে রড এসে পড়ে। ঘটনাস্থলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে আমরাও আতঙ্কিত হয়ে যাই। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কেউ এগিয়ে না এলেও স্থানীয় ও পথচারীরা মিলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করান। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা এর বিচার দাবি করছি। আল্লাহ ক্ষমা করুক, যদি তার কিছু হয়-তাহলে আমরা ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবো।

এদিকে এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় নগরের কোতয়ালী থানায় একটি অভিযোগ করেন চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুর উদ্দিন সুমন। তিনি তার অভিযোগে বলেন, ফিনলে প্রোপার্টিজ লি. এর জিএম এবং ঠিকাদার ইব্রাহিম চট্টগ্রামসহ বিভিন্নস্থানে বেশ কয়েকটি নির্মাণ প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করে। উক্ত নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করাকালে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত ও আহত হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়াতে আলোচনা হইলে ফিনলে কর্তৃপক্ষ নড়ে চড়ে বসে। এমনকি আমি তাদের এসব বিষয়ে বেশ কয়েকবার সতর্ক করার পরেও তারা প্রকল্পের নির্মাণ কাজ চলাকালে শ্রমিকদের কোন প্রকার নিরাপত্তা সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা না করে অবহেলা করছে। তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবহেলার কারণে নির্মাণ শ্রমিকদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। গত ৪ জানুয়ারি দুপুর ১২টায় ফিনলে প্রোপার্টিজ লি. অধীনে মুরাদপুর এলাকায় নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলাকালে হাসান মির্জা (৫০) নামে এক পথচারী রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তার মাথার উপর লোহার রড পড়ায় তিনি গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে তাহাকে স্থানীয় ও পথচারী লোকজন উদ্ধার করে তাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুর উদ্দিন সুমন বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নেই, তাদের অধিকার নেই। আমরা ফিনলে প্রপার্টিজের মালিকদের বারবার অবগত করি। আপনারা শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। তাদের এতবার করে বলার পরও তার কোন শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি। সেফটি নিরাপত্তা না দিয়ে তারা গত এক বছরে আমাদের ২০-২২ জন শ্রমিক অকালে মেরে ফেলে। গত পাঁচ বছরে এই সেফটি ইস্যুতেই আমার হাত দিয়ে অন্তত ৫০টি লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাল থেকে বের করেছি।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ঠিকাদার ইব্রাহিম ও অশোক চৌধুরীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। আর না হলে আমরা চট্টগ্রাম শহরে কঠোর অন্দোলন গড়ে তুলবো।

এদিকে এই বিষয়ে জানতে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের জেনারেল ম্যানেজার অশোককে বেশ কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তাই তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

ফিনলে প্রোপার্টিজ লি. অধীনে মুরাদপুর এলাকায় নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদার ইব্রাহিমকে কল দিলে তিনিও ফোন ধরেননি। তাই তারও বক্তব্য জানা যায়নি।

এদিকে এর আগে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বেলা সোয়া ১২টায় নগরের চকবাজার থানাধীন প্যারেড ময়দানের পাশে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের নির্মাণাধীন ইদ্রিস বিল্ডিংয়ে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে স্পৃষ্ট হয়ে মারা যান জুলাই যোদ্ধার না মো. জাহাঙ্গীর আলম (২৬)। তিনি কুমিল্লার চান্দিনা এলাকার বাসিন্দা। তবে তিনি চট্টগ্রামে থাকতেন পাহাড়তলী থানার ঝাউতলার ডিজেল কলোনিতে।

নিহত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী জানান, জুলাই গণঅভ্যূত্থানে তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম নিজের জীবন বাজি রেখে লড়েছিল। তবে কখনও কোন ক্রেডিট নিতে চাননি। কিন্তু ফিনলে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের অসাবধানতার বলি হতে হয়েছে তাকে। পরিবারে তিনিই কেমন উপার্যনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার এই মৃত্যুতে পরিবারটি এখন নিঃস্ব হয়ে গেল।

সেদিন দুপুরে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে আহত হওয়ার পর জাহাঙ্গিরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনেছিল মিজানুর রহমান নামে তার এক সহকর্মী। তিনি বলেন, আমরা নির্মাণাধীন ওই ভবনের নিচ তলায় ইলেক্ট্রিকের কাজ করছিলাম। খুবই সাবধানভাবে আমরা কাজ করছিলাম। কিন্তু আচমকা জাহাঙ্গির ভাই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যান। বিষয়টি বুঝার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশিক জানান, বেলা ১২টার পর জাহাঙ্গির আলম নামের এক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় চমেক হাসপাতালে আনা হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আবাসন প্রতিষ্ঠান ফিনলে প্রপার্টির ভবনে মৃত্যুর খবর নতুন নয়, ২০১৯ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের ঝাউতলা খুলশী কলোনি এলাকায় আবাসন প্রতিষ্ঠান ফিনলে প্রপার্টির একটি নির্মাণাধীন ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মো. মনির (২৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। মনির ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষণ থানার আলমগীর মাঝির ছেলে।

বাংলাদেশ নির্মাণ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সহসভাপতি কবির হোসেন জানান, ফিনলে প্রপার্টির কোন ভবনেই শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সরঞ্জাম দেওয়া হয় না। যে কারণে ঝুঁকি নিয়েই শ্রমিকরা কাজ করতে হয়। জাহাঙ্গিরের মৃত্যু স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, তাদের নিরাপত্তায় কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে।

ফিনলে প্রপার্টির জেনারেল ম্যানেজার (সেলস) আবদুল্লাহ আল ফারুক (জিয়াদ) বলেন, সেফটি নিশ্চিত করে আমরা অবশ্যই কাজ করি। মুরাদপুরের সিরাজ সেন্টারে সেফটি নিশ্চিত করার জন্য যেই শেডটি দেওয়া হয়, সেটা দেওয়ার মত অবস্থা আগামী মাসে তৈরি হবে। সেটা না দেওয়ার আগেই এই রডটা কিভাবে পড়লো তা বুঝতে পারছি না। উপরে তখন কেউ কাজও করছিল না। আহত হয়েছে তা ঠিক আছে, কিন্তু আমরা এটার সবকিছু দ্রুত আমরা দেখভাল করেছি। আমরা সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি, কিন্তু মাঝে মাঝে দুই একটা দুর্ঘটনা ঘটেই। এটা নিয়ে আমরা খুবই অনুতপ্ত। আমাদের কর্তৃপক্ষও এটি নিয়ে সজাগ আছে।