
ঠিলা কলস ভরে ভরে পানি বয়ে নিতেন নারীরা। তখনো পানি ফুটিয়ে খাওয়ার কথা জানে না অনেকে। ঠিলা বা কলসিতে এক টুকরা ফিটকিরি ফেলে দিলে বুড়িগঙ্গার পানি হয়ে যেত সুস্বাদু ও উপাদেয়।
সাতষট্টি-আটষট্টি সালের কথা। আমরা বন্ধুরা মিলে ছুটির দিনে মিলব্যারাকের পশ্চিম পাশে চলে যেতাম গোসল করতে। বর্ষাকাল। বুড়িগঙ্গার পানি বিপুল স্রোত নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে ধোলাইখালে। স্রোতের কলকল শব্দ হচ্ছে। আমরা গোসল করতে নেমেছি ওই দিকটাতেই। হঠাৎই আমাদের বন্ধু পান্নার আর্তচিৎকার। সাঁতার কাটতে থাকা আর পানিতে লাফঝাঁপ করতে থাকা বন্ধুরা উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়েছি। দেখি পান্না ভেসে যাচ্ছে স্রোতের টানে। ভালো সাঁতার জানে সে। তার পরও স্রোতের তোড়ে এগোতে পারছে না। এক মাঝি দ্রুত নৌকা নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন, পান্নাকে উদ্ধার করেছিলেন। এখন সেই ধোলাইখালটিই নেই। লোহারপুল কাঠেরপুল কোথায় হারিয়ে গেছে! ধোলাইখালের জায়গায় এখন পাকা রাস্তা।
গ্রীষ্মকালে সামান্য সরু হতো বুড়িগঙ্গা। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় আমরা কয়েক বন্ধু মিলে বাজি ধরে সাঁতার কেটে বুড়িগঙ্গা এপার ওপার করেছিলাম। সাঁতার কাটতে কাটতে কত পানি যে খেয়েছিলাম বুড়িগঙ্গার, তা বলা যাবে না। সাঁতার কাটতে গেলে পানি তো মুখে যাবেই। কোথায় হারিয়ে গেছে আমাদের সেই প্রিয় নদীটি! একদার স্বচ্ছতোয়া নদীটি এখন মৃতপ্রায়। ঢাকার মানুষ, আমরা নদীটি মেরে ফেলেছি। এখনো দেশের কোনো কোনো নদী বর্ষায় পাড় ভাঙে। মানুষের ঘরবাড়ি বিলীন হয়। নদীভাঙা মানুষ বলে, ‘নদী সব খেয়ে ফেলেছে।’ বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। মানুষই বুড়িগঙ্গা খেয়ে ফেলেছে। বুড়িগঙ্গার মতো দেশের অনেক নদী খেয়ে ফেলেছে, মেরে ফেলেছে। গত চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরে ধীরে ধীরে, সূক্ষ্মভাবে বুড়িগঙ্গা কলুষিত হতে লাগল, পাড় দখল হতে লাগল। যে যেভাবে পারে নদীটি খেয়ে ফেলতে লাগল। এখন নদীটি ভয়াবহ রকমের অস্তিত্ব সংকটে। শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, দেশের বহু নদী এই সংকটে মরে গেছে। দখল হয়ে গেছে নদী।
বুড়িগঙ্গা দখল চলছে দীর্ঘদিন ধরে। দখল করে নানা ধরনের স্থাপনা তৈরি হয়েছে। কামরাঙ্গীর চর আর কেরানীগঞ্জ প্রান্তেও হয়েছে একই রকমের দখল। বিস্তীর্ণ নদীটি ধীরে ধীরে শীর্ণ হয়ে গেছে। এই দখলে বরাবরই যুক্ত থেকেছে সমাজের নানা ধরনের প্রভাবশালী মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ। নদী দখল করে বসতবাড়ি করা হয়েছে। দোকানপাট মিলকারখানা করা হয়েছে। রেস্টুরেন্ট করা হয়েছে। নদীর অনেকখানি ভেতর পর্যন্ত প্রথমে তৈরি করা হয়েছে মাছের ঘের। তারপর ধীরে ধীরে বালু ফেলে ওই অংশটা ভরাট করা হয়েছে। যিনি ভরাট করেছেন তিনিই জমির মালিক। এইভাবে কোথাও তৈরি করা হয়েছে ডকইয়ার্ড, বালুর গদি।
প্রতিনিধির নাম 























