
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো ওলিদের থেকে প্রকাশিত কারামাত সত্য। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘আহলুস সুন্নাহর মূলনীতি হলো ওলিদের কারামাতে তথা আল্লাহ তাদের মাধ্যমে যে অলৌকিকত্ব প্রকাশ করেন তাতে বিশ্বাস রাখা।…পূর্ববর্তী জাতিগুলো থেকেও কারামাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই উম্মতের মধ্যেও সাহাবি, তাবেয়ি এবং তাদের পরবর্তী সব যুগেই ওলিদের থেকে কারামাত প্রকাশ পেয়েছে। এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা বিদ্যমান থাকবে।’ (আল আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১২৩)
শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহ.) বলেন, কারামাত দুই প্রকার : এক প্রকার যা ইলম ও কাশফের সঙ্গে সম্পর্কিত, আরেক প্রকার হলো যা আল্লাহর কুদরত ও ইশারা সঙ্গে সম্পর্কিত। কখনো ব্যক্তির এমন জ্ঞান থাকে যা অন্যের থাকে না, কখনো আল্লাহ তার সামনে এমন সব বিষয় প্রকাশ করে দেন যা অন্যদের আড়ালে থাকে। কখনো কখনো আল্লাহ বান্দার মাধ্যমে তঁার কুদরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। যেমন মারিয়াম (আ.) কর্তৃক খেজুর গাছের শাখা নাড়ানোর ফলে তরতাজা খেজুর পড়া। অথবা সুলাইমান (আ.)-এর জন্য সিংহাসন হাজির করা। (শরহু আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যাহ : ২/৩০৪)আল কোরআনে কারামাত
পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াত দ্বারা ওলিদের কারামাত প্রমাণিত হয়। যার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো
১. মারিয়াম (আ.)-এর খাদ্য লাভ : ঈসা (আ.)-এর পবিত্র মা আল্লাহর পক্ষ থেকে খাবার লাভ করতেন। তা ছিল তার অলৌকিকত্ব। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখনই জাকারিয়া কক্ষে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেত তখনই তার কাছে খাদ্য-সামগ্রী দেখতে পেত। সে বলত, হে মারিয়াম! এসব তুমি কোথায় পেলে? সে বলত, এটা আল্লাহর নিকট থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩৭)
আল্লামা সাদি (রহ.) বলেন, ‘কোনো কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়াই আল্লাহ তাকে এই জীবিকা দান করেছিলেন। এটা তার কারামাত, আল্লাহ এর মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করেছিলেন।’ (তাফসিরে সাদি, পৃষ্ঠা ১২৯)
হাদিসে কারামাত
অসংখ্য হাদিসের বর্ণনা থেকে ওলিদের কারামাত প্রমাণিত হয়। যেমন সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি জঙ্গলে ভ্রমণ করার সময় হঠাৎ একটি মেঘখণ্ড থেকে আওয়াজ শুনতে পেল যে, অমুকের বাগানে পানি দাও। ব্যক্তি মেঘখণ্ড অনুসরণ করে এগিয়ে যায়। একটি প্রস্তরভূমিতে পৌঁছার পর বর্ষা হলো। ফলে ঐ স্থানের সব নালা পূর্ণ হয়ে গেল। এরপর পানি একটি বাগানের দিকে প্রবাহিত হলো। সে সেখানে এক ব্যক্তিকে কোদাল হাতে দেখতে পেল। তখন পথিক বাগানের মালিকের কাছে এই অলেৌকিকত্বের কারণ জানতে চাইল। তখন মালিক বলল, আমি এ বাগানের উৎপাদিত ফসলের প্রতি লক্ষ্য করি। এর এক-তৃতীয়াংশ সাদাকা করি, এক তৃতীয়াংশ আমি ও আমার পরিবার পরিজন আহার করি এবং এক তৃতীয়াংশ চাষাবাদ ও বাগানের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭২০৩)
মুজিজা ও কারামাতের পার্থক্য
আবু মনসুর বাগদাদি (রহ.) বলেন, অস্বাভাবিক হওয়ার দিক থেকে মুজিজা ও কারামত এক। তবে উভয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। মুজিজা যার থেকে প্রকাশ পায় তিনি তা গোপন করেন না, বরং তা প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিতর্ক করেন। কিন্তু কারামাতের অধিকারী ব্যক্তি কারামাত গোপন রাখা চষ্টো করে। সে এই ব্যাপারে কিছু দাবি করে না। দ্বিতীয়ত যার থেকে মুজিজা প্রকাশ পায় তিনি পাপ ও পরিবর্তন থেকে নিরাপদ। কিন্তু কারামাত যার থেকে প্রকাশ পায় সে পরিবর্তন থেকে নিরাপদ নয়। (উসুলুল ঈমান, পৃষ্ঠা-১৪১)
শয়তানি শক্তি ও কারামাতের পার্থক্য
মানুষের থেকে অলৌকিকত্ব প্রকাশ পাওয়ার অর্থই তা কারামাত নয়। কখনো কখনো শয়তানের উপাসনাকারী ও সাধকদের থেকেও অলৌকিকত্ব প্রকাশ পায়। শয়তানের অনুসারীদের থেকে প্রকাশিত অলৌকিকত্বে ইসি্তদরাজ বা সিহর বলা হয়। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন, ‘যদি তোমরা কোনো ব্যক্তিকে পানির ওপর হঁাটতে এবং আকাশে উড়তে দেখো তবুও তোমরা প্রতারিত হয়ো না। বরং তোমরা তার বিষয়টি কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে যাচাই করবে।’ (তাবাকাতুশ শাফেয়িন, পৃষ্ঠা-৩২)
আবদুল্লাহ ইবনে আবি জারমা (রহ.) বলেন, ‘অস্বাভাবিক ও অলেৌকিক বিষয় সিদ্দিক (নেককার ও সত্যবাদী) ও জিন্দিক (পাপী ও মিথ্যাবাদী) উভয় থেকে প্রকাশ পায়। উভয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো ওলি থেকে যে কারামাত প্রকাশ পায় তা সম্মান এবং এটা অর্জিত হয় কোরআন ও সুন্নাহের আনুগত্যের মাধ্যমে। আর পাপী থেকে যা প্রকাশ পায় তা হলো পরীক্ষা ও বিপদ স্বরূপ। পাপীরা তা অর্জন করে শয়তানের প্ররোচনা ও পথভ্রষ্টতার মাধ্যমে।’ (বাহজাতুন নুফুস : ৪/২৩৯)
পবিত্র কোরআনেও শয়তানের সাধকদের শক্তি লাভের ব্যাপারে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণে বিমুখ হয় আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সে হয় তার সহচর।’ (সুরা জুখরুফ, আয়াত : ৩৬)
কারামাত অস্বীকার করার বিধান
ফকিহ আলেমরা বলেন, কারামাত অস্বীকার করা গুনাহের কাজ। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘অকাট্য আয়াত ও স্পষ্ট হাদিস দ্বারা ওলিদের কারামাত প্রমাণিত। গুমরাহ বিদআতি অথবা মারাত্মক ফাসেক লোক ছাড়া কেউ তা অস্বীকার করতে পারে না।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ৫/৩২৫)
আল্লাহ সবাইকে সত্য জানার এবং তার অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আমিন।
প্রতিনিধির নাম 




























