
রিলায়েন্স বিশাল আকারের তেলবাহী জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রপথে ভারতের জামনগরের নিকটবর্তী বন্দরগুলোতে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে। সুপার ট্যাংকারগুলো উপকূলের অদূরে স্থাপিত ‘সিঙ্গেল-পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)-এর মাধ্যমে বিশাল সব স্টোরেজ ট্যাংকে অপরিশোধিত তেল খালাস করে। এরপর অপরিশোধিত তেল জামনগর রিফাইনারিতে পাঠানো হয়, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও জটিল তেল শোধন কেন্দ্র। এ রিফাইনারি অপরিশোধিত তেলকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি যেমন-পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েল এবং পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টকে রূপান্তর করে।
সিঙ্গাপুরে আছে এক্সনমোবিল ও শেলের মতো বড় কোম্পানি : সিঙ্গাপুরের নিজস্ব কোনো অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত নেই। দেশটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য আমদানি করে। এরপর দেশটির জুরং দ্বীপের বড় বড় শোধনাগারে তা প্রক্রিয়াজাত করে এবং পরিশোধিত পণ্যগুলো পুনরায় রপ্তানি করে বা বিশ্বের বৃহত্তম সামুদ্রিক বাংকারিং বন্দর (জাহাজের জ্বালানি সরবরাহ) হিসেবে বিক্রি করে। দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকের বেশি আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এ ছাড়া রাশিয়া এবং এশিয়ার আঞ্চলিক অংশীদার দেশগুলো থেকেও অতিরিক্ত পরিশোধিত পণ্য ও বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহ করে সিঙ্গাপুর। সুপার ট্যাংকারগুলো অপরিশোধিত তেল এবং মধ্যবর্তী পণ্য সিঙ্গাপুরের বিশেষায়িত বন্দর টার্মিনালে নিয়ে আসে। এক্সনমোবিল ও শেলের মতো বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো স্থানীয় বিশাল শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে গ্যাসোলিন, ডিজেল, জেট ফুয়েল ও ন্যাপথায় রূপান্তর করে। সিঙ্গাপুর এই প্রস্তুতকৃত পণ্যগুলো প্রতিবেশী এশীয় দেশগুলোর কাছে বিক্রি করে। দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে তা ব্যবহার করে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক কার্গো জাহাজগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি (বাংকার ফুয়েল) সরবরাহ করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার তেল বাজার সামলায় বেসরকারি খাত : দক্ষিণ কোরিয়ার ডাউনস্ট্রিম জ্বালানি তেল বাজারের নিয়ন্ত্রণ মূলত চারটি বড় বেসরকারি শোধনাগার কোম্পানির হাতে। এ কোম্পানিগুলো মূলত বেসরকারি অলাভজনক সংগঠন কোরিয়া পেট্রোলিয়াম অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে সংগঠিত। এই বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলো বিশ্ববাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা দক্ষিণ কোরিয়ায় শোধন করে। আর উৎপাদিত পেট্রোলিয়াম পণ্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে। দেশটির প্রধান বেসরকারি তেল আমদানিকারক ও শোধনাগার কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে- এসকে এনার্জি। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার পুরোনো এবং বৃহত্তম তেল শোধনাগার কোম্পানি, যা এসকে ইনোভেশনের একটি প্রধান অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম চালায়। এসকে এনার্জি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি ও জ্বালানি শোধন করে। আর দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির বিস্তৃত সার্ভিস স্টেশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা বিতরণ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম বেসরকারি তেল শোধনাগার হচ্ছে জিএস ক্যালটেক্স। এটি জিএস গ্রুপ ও শেভরনের মধ্যে ৫০-৫০ অংশীদারিত্বে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পেট্রোলিয়াম ও লুব্রিকেটিং পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যে এটি মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এ ছাড়া এইচডি হুন্দাই অয়েল ব্যাংক দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম বেসরকারি তেল শোধনাগার কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে এটি এইচডি হুন্দাইয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যারা অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল আমদানি করে। জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির অনুমতি দেব। এজন্য নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। এই নীতিমালা সবার জন্য উন্মুক্ত। যার টাকা আছে সে এই নীতি অনুসরণ করে তেল আমদানি করবে। বর্তমানে বিষয়টি যাচাইবাছাই পর্যায়ে আছে।
সম্প্রতি সরকার দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের পুরো চাহিদা মেটাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সরকার বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর একার পক্ষে দেশের জ্বালানি তেলের বিপুল চাহিদা একা মেটানো সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এবার এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। আবার বিপিসির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় দুর্নীতি ও অদক্ষতার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম লস ২০ শতাংশের বেশি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বেসরকারি খাতকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে এক ধরনের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা পরবর্তীতে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।
প্রতিনিধির নাম 


























