ঢাকা ০১:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

বিশ্বব্যাপী সরকারকে সহায়তা করছে বেসরকারি খাত

জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সহায়তা নিচ্ছে। এশিয়ায় চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া এ তালিকায় রয়েছে।জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা এবং স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এসব দেশে বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন কার্যক্রম বহু আগে থেকেই সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশগুলো আমদানীকৃত উদ্বৃত্ত জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করছে। এ দেশগুলোর বেসরকারি উদ্যোক্তারা অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি পরিশোধনাগারে পরিশোধন করছে। পরে তা স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি স্টেশন, শিল্পকারখানায় বিক্রি করছে।

এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি, পরিচালন ব্যয় এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে খুচরা জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। দেশের বাইরে আঞ্চলিক বাজারেও তারা এ জ্বালানি বিক্রি করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে সংযুক্ত করার বিষয়টি সরকার বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।ভারতজুড়ে জ্বালানি তেল বিক্রি করছে রিলায়েন্স : ভারতের বেসরকারি কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। গুজরাটের বিশাল জামনগর রিফাইনারি কমপ্লেক্সে তা পরিশোধন করা হয়। এই পরিশোধনাগারে উৎপাদন হয় পেট্রোল ও ডিজেল। রিলায়েন্স তাদের নিজস্ব খুচরা জ্বালানি স্টেশনের নেটওয়ার্ক ও শিল্প গ্রাহকদের কাছে ভারতজুড়ে এ জ্বালানি বিক্রি করে। মূলত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, আমেরিকা এবং রাশিয়ার জাতীয় তেল কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভারতের এ বেসরকারি কোম্পানিটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট ক্রয়ের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে।

রিলায়েন্স বিশাল আকারের তেলবাহী জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রপথে ভারতের জামনগরের নিকটবর্তী বন্দরগুলোতে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে। সুপার ট্যাংকারগুলো উপকূলের অদূরে স্থাপিত ‘সিঙ্গেল-পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)-এর মাধ্যমে বিশাল সব স্টোরেজ ট্যাংকে অপরিশোধিত তেল খালাস করে। এরপর অপরিশোধিত তেল জামনগর রিফাইনারিতে পাঠানো হয়, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও জটিল তেল শোধন কেন্দ্র। এ রিফাইনারি অপরিশোধিত তেলকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি যেমন-পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েল এবং পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টকে রূপান্তর করে।

রিলায়েন্স ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নিজস্ব মালিকানাধীন বা ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালিত শত শত খুচরা জ্বালানি পাম্পের মাধ্যমে পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রি করে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর বিপরীতে রিলায়েন্সের মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলো প্রায়ই স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি, পরিচালন ব্যয় এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে খুচরা জ্বালানির দাম সমন্বয় করে। রিলায়েন্স বড় বাণিজ্যিক গ্রাহক, পরিবহন বহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্পমালিকদের কাছে সরাসরি পরিশোধিত পণ্য বিক্রি করে।চীনে সরকারের সঙ্গে আছে বেসরকারি খাতও : এশিয়ার বৃহৎ দেশ চীন। দেশটির বেসরকারি খাত রাশিয়া, সৌদি আরব এবং ব্রাজিলের মতো বৈশ্বিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এরপর তা রাষ্ট্রীয় ও স্বতন্ত্র শোধনাগারের মাধ্যমে পরিশোধন করে। উৎপাদিত পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক বাজারে বিক্রি করে। চীন প্রায় ৫০টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল ক্রয় করে। চীনের প্রধান তেল সরবরাহকারীদের মধ্যে আছে-রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও ব্রাজিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন-সিনোপেক ও সিএনপিসি এবং বেসরকারি শোধনাগারগুলো আমদানীকৃত অপরিশোধিত তেলকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ও পেট্রোকেমিকেলে রূপান্তর করে। পরিশোধিত পণ্যগুলো চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ শিল্প ও পরিবহন বাজারে ব্যাপক বিক্রি হয়। আর উদ্বৃত্ত পরিশোধিত জ্বালানি সরকারের নির্ধারিত রপ্তানি কোটা অনুযায়ী এশিয়ার বিভিন্ন আঞ্চলিক বাজার যেমন- সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনে রপ্তানি হয়।

সিঙ্গাপুরে আছে এক্সনমোবিল ও শেলের মতো বড় কোম্পানি : সিঙ্গাপুরের নিজস্ব কোনো অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত নেই। দেশটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য আমদানি করে। এরপর দেশটির জুরং দ্বীপের বড় বড় শোধনাগারে তা প্রক্রিয়াজাত করে এবং পরিশোধিত পণ্যগুলো পুনরায় রপ্তানি করে বা বিশ্বের বৃহত্তম সামুদ্রিক বাংকারিং বন্দর (জাহাজের জ্বালানি সরবরাহ) হিসেবে বিক্রি করে। দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকের বেশি আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এ ছাড়া রাশিয়া এবং এশিয়ার আঞ্চলিক অংশীদার দেশগুলো থেকেও অতিরিক্ত পরিশোধিত পণ্য ও বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহ করে সিঙ্গাপুর। সুপার ট্যাংকারগুলো অপরিশোধিত তেল এবং মধ্যবর্তী পণ্য সিঙ্গাপুরের বিশেষায়িত বন্দর টার্মিনালে নিয়ে আসে। এক্সনমোবিল ও শেলের মতো বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো স্থানীয় বিশাল শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে গ্যাসোলিন, ডিজেল, জেট ফুয়েল ও ন্যাপথায় রূপান্তর করে। সিঙ্গাপুর এই প্রস্তুতকৃত পণ্যগুলো প্রতিবেশী এশীয় দেশগুলোর কাছে বিক্রি করে। দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে তা ব্যবহার করে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক কার্গো জাহাজগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি (বাংকার ফুয়েল) সরবরাহ করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার তেল বাজার সামলায় বেসরকারি খাত : দক্ষিণ কোরিয়ার ডাউনস্ট্রিম জ্বালানি তেল বাজারের নিয়ন্ত্রণ মূলত চারটি বড় বেসরকারি শোধনাগার কোম্পানির হাতে। এ কোম্পানিগুলো মূলত বেসরকারি অলাভজনক সংগঠন কোরিয়া পেট্রোলিয়াম অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে সংগঠিত। এই বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলো বিশ্ববাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা দক্ষিণ কোরিয়ায় শোধন করে। আর উৎপাদিত পেট্রোলিয়াম পণ্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে। দেশটির প্রধান বেসরকারি তেল আমদানিকারক ও শোধনাগার কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে- এসকে এনার্জি। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার পুরোনো এবং বৃহত্তম তেল শোধনাগার কোম্পানি, যা এসকে ইনোভেশনের একটি প্রধান অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম চালায়। এসকে এনার্জি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি ও জ্বালানি শোধন করে। আর দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির বিস্তৃত সার্ভিস স্টেশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা বিতরণ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম বেসরকারি তেল শোধনাগার হচ্ছে জিএস ক্যালটেক্স। এটি জিএস গ্রুপ ও শেভরনের মধ্যে ৫০-৫০ অংশীদারিত্বে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পেট্রোলিয়াম ও লুব্রিকেটিং পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যে এটি মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এ ছাড়া এইচডি হুন্দাই অয়েল ব্যাংক দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম বেসরকারি তেল শোধনাগার কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে এটি এইচডি হুন্দাইয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যারা অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল আমদানি করে। জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির অনুমতি দেব। এজন্য নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। এই নীতিমালা সবার জন্য উন্মুক্ত। যার টাকা আছে সে এই নীতি অনুসরণ করে তেল আমদানি করবে। বর্তমানে বিষয়টি যাচাইবাছাই পর্যায়ে আছে।

সম্প্রতি সরকার দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের পুরো চাহিদা মেটাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সরকার বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর একার পক্ষে দেশের জ্বালানি তেলের বিপুল চাহিদা একা মেটানো সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এবার এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। আবার বিপিসির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় দুর্নীতি ও অদক্ষতার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম লস ২০ শতাংশের বেশি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বেসরকারি  খাতকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে এক ধরনের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা পরবর্তীতে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বব্যাপী সরকারকে সহায়তা করছে বেসরকারি খাত

আপডেট সময় : ১০:৩১:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সহায়তা নিচ্ছে। এশিয়ায় চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া এ তালিকায় রয়েছে।জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা এবং স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এসব দেশে বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন কার্যক্রম বহু আগে থেকেই সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশগুলো আমদানীকৃত উদ্বৃত্ত জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করছে। এ দেশগুলোর বেসরকারি উদ্যোক্তারা অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি পরিশোধনাগারে পরিশোধন করছে। পরে তা স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি স্টেশন, শিল্পকারখানায় বিক্রি করছে।

এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি, পরিচালন ব্যয় এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে খুচরা জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। দেশের বাইরে আঞ্চলিক বাজারেও তারা এ জ্বালানি বিক্রি করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে সংযুক্ত করার বিষয়টি সরকার বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।ভারতজুড়ে জ্বালানি তেল বিক্রি করছে রিলায়েন্স : ভারতের বেসরকারি কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। গুজরাটের বিশাল জামনগর রিফাইনারি কমপ্লেক্সে তা পরিশোধন করা হয়। এই পরিশোধনাগারে উৎপাদন হয় পেট্রোল ও ডিজেল। রিলায়েন্স তাদের নিজস্ব খুচরা জ্বালানি স্টেশনের নেটওয়ার্ক ও শিল্প গ্রাহকদের কাছে ভারতজুড়ে এ জ্বালানি বিক্রি করে। মূলত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, আমেরিকা এবং রাশিয়ার জাতীয় তেল কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভারতের এ বেসরকারি কোম্পানিটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট ক্রয়ের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে।

রিলায়েন্স বিশাল আকারের তেলবাহী জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রপথে ভারতের জামনগরের নিকটবর্তী বন্দরগুলোতে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে। সুপার ট্যাংকারগুলো উপকূলের অদূরে স্থাপিত ‘সিঙ্গেল-পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)-এর মাধ্যমে বিশাল সব স্টোরেজ ট্যাংকে অপরিশোধিত তেল খালাস করে। এরপর অপরিশোধিত তেল জামনগর রিফাইনারিতে পাঠানো হয়, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও জটিল তেল শোধন কেন্দ্র। এ রিফাইনারি অপরিশোধিত তেলকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি যেমন-পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েল এবং পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টকে রূপান্তর করে।

রিলায়েন্স ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নিজস্ব মালিকানাধীন বা ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালিত শত শত খুচরা জ্বালানি পাম্পের মাধ্যমে পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রি করে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর বিপরীতে রিলায়েন্সের মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলো প্রায়ই স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি, পরিচালন ব্যয় এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে খুচরা জ্বালানির দাম সমন্বয় করে। রিলায়েন্স বড় বাণিজ্যিক গ্রাহক, পরিবহন বহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্পমালিকদের কাছে সরাসরি পরিশোধিত পণ্য বিক্রি করে।চীনে সরকারের সঙ্গে আছে বেসরকারি খাতও : এশিয়ার বৃহৎ দেশ চীন। দেশটির বেসরকারি খাত রাশিয়া, সৌদি আরব এবং ব্রাজিলের মতো বৈশ্বিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এরপর তা রাষ্ট্রীয় ও স্বতন্ত্র শোধনাগারের মাধ্যমে পরিশোধন করে। উৎপাদিত পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক বাজারে বিক্রি করে। চীন প্রায় ৫০টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল ক্রয় করে। চীনের প্রধান তেল সরবরাহকারীদের মধ্যে আছে-রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও ব্রাজিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন-সিনোপেক ও সিএনপিসি এবং বেসরকারি শোধনাগারগুলো আমদানীকৃত অপরিশোধিত তেলকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ও পেট্রোকেমিকেলে রূপান্তর করে। পরিশোধিত পণ্যগুলো চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ শিল্প ও পরিবহন বাজারে ব্যাপক বিক্রি হয়। আর উদ্বৃত্ত পরিশোধিত জ্বালানি সরকারের নির্ধারিত রপ্তানি কোটা অনুযায়ী এশিয়ার বিভিন্ন আঞ্চলিক বাজার যেমন- সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনে রপ্তানি হয়।

সিঙ্গাপুরে আছে এক্সনমোবিল ও শেলের মতো বড় কোম্পানি : সিঙ্গাপুরের নিজস্ব কোনো অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত নেই। দেশটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য আমদানি করে। এরপর দেশটির জুরং দ্বীপের বড় বড় শোধনাগারে তা প্রক্রিয়াজাত করে এবং পরিশোধিত পণ্যগুলো পুনরায় রপ্তানি করে বা বিশ্বের বৃহত্তম সামুদ্রিক বাংকারিং বন্দর (জাহাজের জ্বালানি সরবরাহ) হিসেবে বিক্রি করে। দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকের বেশি আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এ ছাড়া রাশিয়া এবং এশিয়ার আঞ্চলিক অংশীদার দেশগুলো থেকেও অতিরিক্ত পরিশোধিত পণ্য ও বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহ করে সিঙ্গাপুর। সুপার ট্যাংকারগুলো অপরিশোধিত তেল এবং মধ্যবর্তী পণ্য সিঙ্গাপুরের বিশেষায়িত বন্দর টার্মিনালে নিয়ে আসে। এক্সনমোবিল ও শেলের মতো বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো স্থানীয় বিশাল শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে গ্যাসোলিন, ডিজেল, জেট ফুয়েল ও ন্যাপথায় রূপান্তর করে। সিঙ্গাপুর এই প্রস্তুতকৃত পণ্যগুলো প্রতিবেশী এশীয় দেশগুলোর কাছে বিক্রি করে। দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে তা ব্যবহার করে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক কার্গো জাহাজগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি (বাংকার ফুয়েল) সরবরাহ করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার তেল বাজার সামলায় বেসরকারি খাত : দক্ষিণ কোরিয়ার ডাউনস্ট্রিম জ্বালানি তেল বাজারের নিয়ন্ত্রণ মূলত চারটি বড় বেসরকারি শোধনাগার কোম্পানির হাতে। এ কোম্পানিগুলো মূলত বেসরকারি অলাভজনক সংগঠন কোরিয়া পেট্রোলিয়াম অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে সংগঠিত। এই বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলো বিশ্ববাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা দক্ষিণ কোরিয়ায় শোধন করে। আর উৎপাদিত পেট্রোলিয়াম পণ্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে। দেশটির প্রধান বেসরকারি তেল আমদানিকারক ও শোধনাগার কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে- এসকে এনার্জি। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার পুরোনো এবং বৃহত্তম তেল শোধনাগার কোম্পানি, যা এসকে ইনোভেশনের একটি প্রধান অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম চালায়। এসকে এনার্জি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি ও জ্বালানি শোধন করে। আর দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির বিস্তৃত সার্ভিস স্টেশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা বিতরণ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম বেসরকারি তেল শোধনাগার হচ্ছে জিএস ক্যালটেক্স। এটি জিএস গ্রুপ ও শেভরনের মধ্যে ৫০-৫০ অংশীদারিত্বে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পেট্রোলিয়াম ও লুব্রিকেটিং পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যে এটি মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এ ছাড়া এইচডি হুন্দাই অয়েল ব্যাংক দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম বেসরকারি তেল শোধনাগার কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে এটি এইচডি হুন্দাইয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যারা অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল আমদানি করে। জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির অনুমতি দেব। এজন্য নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। এই নীতিমালা সবার জন্য উন্মুক্ত। যার টাকা আছে সে এই নীতি অনুসরণ করে তেল আমদানি করবে। বর্তমানে বিষয়টি যাচাইবাছাই পর্যায়ে আছে।

সম্প্রতি সরকার দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের পুরো চাহিদা মেটাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সরকার বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর একার পক্ষে দেশের জ্বালানি তেলের বিপুল চাহিদা একা মেটানো সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এবার এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। আবার বিপিসির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় দুর্নীতি ও অদক্ষতার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম লস ২০ শতাংশের বেশি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বেসরকারি  খাতকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে এক ধরনের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা পরবর্তীতে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।