ঢাকা ০৫:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২

সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর: প্রতিভা, দ্বন্দ্ব ও বিশ্বসংগীতে অবিনশ্বর এক আলো

সেতারের কিংবদন্তি পণ্ডিত রবিশঙ্কর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছেন যে মহিরুহ হিসেবে, তাঁর প্রয়াণদিবস আজ ১১ ডিসেম্বর।

নড়াইলের শিকড় ও বারানসির সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রশঙ্কর চৌধুরী শৈশবে বড় ভাই উদয়শঙ্করের নৃত্যদলের সঙ্গে ইউরোপ ঘুরে শিল্পবোধের ভিত গড়ে তোলেন। প্যারিসে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মাইহারের কঠোর রেওয়াজ তাঁকে পরিণত করে এক প্রাতিস্বিক সেতারবাদকে।

১৯৫৪ সাল থেকে তিনি শুরু করেন আন্তর্জাতিক সংগীতযাত্রা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে পরিবেশনার মাধ্যমে অপরিচিত রাগসঙ্গীতকে তিনি পৌঁছে দেন বিশ্বশ্রোতার কাছে। শুধুই পরিবেশনা নয়—কর্মশালা, বক্তৃতা ও আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেন ভারতীয় সংগীতের দর্শন ও শৈলী। জর্জ হ্যারিসনসহ পাশ্চাত্যের তারকাদের সঙ্গে তাঁর কাজ ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক’ ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’সহ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনায় তিনি গড়ে তোলেন সংযমী ও গভীর এক নতুন ভাষা।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবিক ভূমিকা রেখে তিনি আয়োজন করেন ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এই আয়োজন কেবল ত্রাণ সংগ্রহই নয়, বিশ্বজনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।
তাঁর জীবনের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায় ওস্তাদ বিলায়েত খাঁর সঙ্গে সম্পর্ক। সখ্য, শ্রদ্ধা ও নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতার মিশ্রণে এই সম্পর্ক ছিল ইতিহাসের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের তুলনা ও সমালোচনা তাঁকে আহত করলেও তিনি কখনোই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সংগীতের মূলমঞ্চে আনতে দেননি। রবিশঙ্করের অকপট স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে সংগীতজগতে ধর্ম ও পরিচয়ভিত্তিক টানাপোড়েনও—যেখানে তিনি নিজেও ভেবেছিলেন নামের শেষে ‘খাঁ’ যোগ করলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে কিনা। শেষ পর্যন্ত তিনি তা না করে প্রমাণ করেছেন—পরিচয় নয়, শিল্পই সবচেয়ে বড় শক্তি।

শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক দূতিয়ালির সমন্বয়ে রবিশঙ্কর বিশ্বসংগীতে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবেন। তাঁর জীবনের সত্য, সাহস ও সুর আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের শিল্প বড় হয় মানবিকতা দিয়ে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

২০২৬ সালের রমজান ও ঈদের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা

সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর: প্রতিভা, দ্বন্দ্ব ও বিশ্বসংগীতে অবিনশ্বর এক আলো

আপডেট সময় : ০৫:০২:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

সেতারের কিংবদন্তি পণ্ডিত রবিশঙ্কর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছেন যে মহিরুহ হিসেবে, তাঁর প্রয়াণদিবস আজ ১১ ডিসেম্বর।

নড়াইলের শিকড় ও বারানসির সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রশঙ্কর চৌধুরী শৈশবে বড় ভাই উদয়শঙ্করের নৃত্যদলের সঙ্গে ইউরোপ ঘুরে শিল্পবোধের ভিত গড়ে তোলেন। প্যারিসে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মাইহারের কঠোর রেওয়াজ তাঁকে পরিণত করে এক প্রাতিস্বিক সেতারবাদকে।

১৯৫৪ সাল থেকে তিনি শুরু করেন আন্তর্জাতিক সংগীতযাত্রা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে পরিবেশনার মাধ্যমে অপরিচিত রাগসঙ্গীতকে তিনি পৌঁছে দেন বিশ্বশ্রোতার কাছে। শুধুই পরিবেশনা নয়—কর্মশালা, বক্তৃতা ও আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেন ভারতীয় সংগীতের দর্শন ও শৈলী। জর্জ হ্যারিসনসহ পাশ্চাত্যের তারকাদের সঙ্গে তাঁর কাজ ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক’ ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’সহ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনায় তিনি গড়ে তোলেন সংযমী ও গভীর এক নতুন ভাষা।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবিক ভূমিকা রেখে তিনি আয়োজন করেন ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এই আয়োজন কেবল ত্রাণ সংগ্রহই নয়, বিশ্বজনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।
তাঁর জীবনের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায় ওস্তাদ বিলায়েত খাঁর সঙ্গে সম্পর্ক। সখ্য, শ্রদ্ধা ও নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতার মিশ্রণে এই সম্পর্ক ছিল ইতিহাসের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের তুলনা ও সমালোচনা তাঁকে আহত করলেও তিনি কখনোই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সংগীতের মূলমঞ্চে আনতে দেননি। রবিশঙ্করের অকপট স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে সংগীতজগতে ধর্ম ও পরিচয়ভিত্তিক টানাপোড়েনও—যেখানে তিনি নিজেও ভেবেছিলেন নামের শেষে ‘খাঁ’ যোগ করলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে কিনা। শেষ পর্যন্ত তিনি তা না করে প্রমাণ করেছেন—পরিচয় নয়, শিল্পই সবচেয়ে বড় শক্তি।

শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক দূতিয়ালির সমন্বয়ে রবিশঙ্কর বিশ্বসংগীতে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবেন। তাঁর জীবনের সত্য, সাহস ও সুর আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের শিল্প বড় হয় মানবিকতা দিয়ে।