ঢাকা ০১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ সাজিনাস হসপিটালের মোমিনের বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক : হাইকোর্ট ও দেওয়ানি আদালতের রায়-নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভুয়া দলিল সৃজন ও প্রশাসনিক আবেদনকে হাতিয়ার বানিয়ে জমি দখলের পাঁয়তারার অভিযোগ উঠেছে সাজিনাস হসপিটালের সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ মমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। বিরোধপূর্ণ জমিতে বাস্তব দখল না থাকা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়ে দখলের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ তুলে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ।

​ঘটনাটি চট্টগ্রাম জেলার বায়েজিদ বোস্তামী থানার জালালাবাদ মৌজার বি.এস. ৮০৫ নম্বর দাগের অন্দর .১৮৫০ একর সম্পত্তি কেন্দ্র করে।

ঘটনার পটভূমি ও প্রশাসনিক আবেদন:
​প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সাজিনাস হসপিটালের সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম-এর কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে তিনি দাবি করেন, ২২ এপ্রিল ২০২৪ তারিখের ৪৭৮৪ নম্বর কবলা দলিলের মাধ্যমে তিনি মাহফুজা খাতুন গংয়ের কাছ থেকে বিরোধীয় সম্পত্তি ক্রয় করেছেন এবং বি.এস. নামজারি খতিয়ান নং ৩২২৯ সৃজন করেছেন। আবেদনে উক্ত জমির দখলদার দেলোয়ার হোসেন ও রেখা আক্তারকে সরিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের লিজকৃত জমি বি.এস. ৮২৪ নম্বর দাগে স্থানান্তরের জন্য প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

আপত্তিকারীর মূল অভিযোগ ও আইনি যুক্তিসমূহ:
​আবেদনকারীর এমন পদক্ষেপের বিপরীতে জেলা প্রশাসকের কাছে আইনগত আপত্তি দাখিল করেছেন উক্ত সম্পত্তিতে বাস্তব দখলে থাকা অন্য এক পক্ষ। আপত্তিতে আবেদনকারীর দাবিকে অবৈধ ও প্রতারণামূলক উল্লেখ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় তুলে ধরা হয়:
​ বাস্তব দখলের অনুপস্থিতি:
মমিনুল ইসলাম নিজেই তাঁর আবেদনে স্বীকার করেছেন যে উক্ত .১৮৫০ একর জমিতে তাঁর বাস্তব দখল নেই। আইন অনুযায়ী, প্রশাসনিক কোনো আবেদনের মাধ্যমে কাউকে ‘বেদখলকারী’ চিহ্নিত করে উচ্ছেদ করার এখতিয়ার জেলা প্রশাসনের নেই; এটি দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত।
​বিক্রেতাদের স্বত্বহীনতা ও ভুয়া দলিল:
যার কাছ থেকে মমিনুল ইসলাম জমি কিনেছেন (মাহফুজা খাতুন গং), অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ ট্রাইব্যুনালের মামলা নং ১৬৮৯১/২০১৩ এবং আপিল মামলা নং ১১/২০২৩-এর রায়ে তাঁদের অনুকূলে জমি মুক্ত হলেও বাস্তব দখল হস্তান্তরের কোনো নির্দেশ ছিল না। স্বত্ব ও বাস্তব দখলবিহীন বিক্রেতার কাছ থেকে জমি ক্রয় করায় মমিনুল ইসলামের দলিলের (নং ৪৭৮৪) আইনি বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ।
​হাইকোর্ট ও দেওয়ানি আদালতের বহাল রায়:
বিরোধীয় বি.এস. ৮০৫ নম্বর দাগসহ ১.৫৯ একর জমি নিয়ে সিনিয়র সহকারী জজ ৫ম আদালত, চট্টগ্রামে দায়েরকৃত অপর ২১৩/১৯৯০ নম্বর মামলায় ১৯৯৯ সালে সরকারপক্ষের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ডিক্রি লাভ করেন আপত্তিকারী পক্ষ। পরবর্তীতে সরকার আপিল করলে তা খারিজ হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিভিশন (নং ৩৩৯৬/২০০৮) মঞ্জুর করে উক্ত ডিক্রি বহাল রাখেন। ফলে এই জমিতে যেকোনো ধরনের উচ্ছেদ বা পরিবর্তন আদালতের রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন।
​একাধিক বিচারাধীন দেওয়ানি মামলা:
বর্তমানে উক্ত জমির স্বত্ব ও দখল নিয়ে যুগ্ম জেলা জজ ৩য় আদালতে (মামলা নং ৬৯১/২০১০), সিনিয়র সহকারী জজ ৫ম আদালতে (মামলা নং ৪৪০/২০২১) এবং অর্পিত সম্পত্তি ট্রাইব্যুনালে (মামলা নং ১২২২) মামলা বিচারাধীন। বিচারিক আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা বিচার প্রক্রিয়ায় বাধার শামিল।
​অস্পষ্ট সীমানা ও নামজারির সীমাবদ্ধতা:
আবেদনে .১৮৫০ একর জমির কোনো নির্দিষ্ট চৌহদ্দী বা সীমানা উল্লেখ করা হয়নি। আইন অনুযায়ী, কেবল নামজারি বা জমাভাগ খতিয়ান (খতিয়ান নং ৩২১০ ও ৩২২৯) কোনো ভূমির মূল স্বত্ব বা দখলের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না।

*​বিরোধীয় সম্পত্তির তফসিল:*
• ​জেলা: চট্টগ্রাম
• ​থানা: বায়েজিদ বোস্তামী
• ​মৌজা: জালালাবাদ
• ​খতিয়ান ও দাগ: আর.এস. ৩৪ নম্বর খতিয়ানের আর.এস. ১১১৬/১১১৭ নম্বর দাগের সামিল বি.এস. ১৩৪ নম্বর খতিয়ানের বি.এস. ৮০৫ নম্বর দাগ।
• ​পরিমাণ: .১৮৫০ একর (নাল ভূমি)
​বর্তমান পরিস্থিতি:
​আপত্তিকারী পক্ষ জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনটি অবিলম্বে খারিজ করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দেওয়ানি আদালত ও হাইকোর্টের রায় পর্যালোচনা না করে এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রকার উচ্ছেদ বা স্থানান্তর কার্যক্রম গ্রহণ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

​এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো কিছু জানা যায়নি। সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নথিপত্র, হাইকোর্টের নির্দেশ ও সরেজমিন দখল পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ সাজিনাস হসপিটালের মোমিনের বিরুদ্ধে

হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ সাজিনাস হসপিটালের মোমিনের বিরুদ্ধে

আপডেট সময় : ০১:১৬:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : হাইকোর্ট ও দেওয়ানি আদালতের রায়-নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভুয়া দলিল সৃজন ও প্রশাসনিক আবেদনকে হাতিয়ার বানিয়ে জমি দখলের পাঁয়তারার অভিযোগ উঠেছে সাজিনাস হসপিটালের সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ মমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। বিরোধপূর্ণ জমিতে বাস্তব দখল না থাকা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়ে দখলের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ তুলে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ।

​ঘটনাটি চট্টগ্রাম জেলার বায়েজিদ বোস্তামী থানার জালালাবাদ মৌজার বি.এস. ৮০৫ নম্বর দাগের অন্দর .১৮৫০ একর সম্পত্তি কেন্দ্র করে।

ঘটনার পটভূমি ও প্রশাসনিক আবেদন:
​প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সাজিনাস হসপিটালের সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম-এর কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে তিনি দাবি করেন, ২২ এপ্রিল ২০২৪ তারিখের ৪৭৮৪ নম্বর কবলা দলিলের মাধ্যমে তিনি মাহফুজা খাতুন গংয়ের কাছ থেকে বিরোধীয় সম্পত্তি ক্রয় করেছেন এবং বি.এস. নামজারি খতিয়ান নং ৩২২৯ সৃজন করেছেন। আবেদনে উক্ত জমির দখলদার দেলোয়ার হোসেন ও রেখা আক্তারকে সরিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের লিজকৃত জমি বি.এস. ৮২৪ নম্বর দাগে স্থানান্তরের জন্য প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

আপত্তিকারীর মূল অভিযোগ ও আইনি যুক্তিসমূহ:
​আবেদনকারীর এমন পদক্ষেপের বিপরীতে জেলা প্রশাসকের কাছে আইনগত আপত্তি দাখিল করেছেন উক্ত সম্পত্তিতে বাস্তব দখলে থাকা অন্য এক পক্ষ। আপত্তিতে আবেদনকারীর দাবিকে অবৈধ ও প্রতারণামূলক উল্লেখ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় তুলে ধরা হয়:
​ বাস্তব দখলের অনুপস্থিতি:
মমিনুল ইসলাম নিজেই তাঁর আবেদনে স্বীকার করেছেন যে উক্ত .১৮৫০ একর জমিতে তাঁর বাস্তব দখল নেই। আইন অনুযায়ী, প্রশাসনিক কোনো আবেদনের মাধ্যমে কাউকে ‘বেদখলকারী’ চিহ্নিত করে উচ্ছেদ করার এখতিয়ার জেলা প্রশাসনের নেই; এটি দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত।
​বিক্রেতাদের স্বত্বহীনতা ও ভুয়া দলিল:
যার কাছ থেকে মমিনুল ইসলাম জমি কিনেছেন (মাহফুজা খাতুন গং), অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ ট্রাইব্যুনালের মামলা নং ১৬৮৯১/২০১৩ এবং আপিল মামলা নং ১১/২০২৩-এর রায়ে তাঁদের অনুকূলে জমি মুক্ত হলেও বাস্তব দখল হস্তান্তরের কোনো নির্দেশ ছিল না। স্বত্ব ও বাস্তব দখলবিহীন বিক্রেতার কাছ থেকে জমি ক্রয় করায় মমিনুল ইসলামের দলিলের (নং ৪৭৮৪) আইনি বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ।
​হাইকোর্ট ও দেওয়ানি আদালতের বহাল রায়:
বিরোধীয় বি.এস. ৮০৫ নম্বর দাগসহ ১.৫৯ একর জমি নিয়ে সিনিয়র সহকারী জজ ৫ম আদালত, চট্টগ্রামে দায়েরকৃত অপর ২১৩/১৯৯০ নম্বর মামলায় ১৯৯৯ সালে সরকারপক্ষের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ডিক্রি লাভ করেন আপত্তিকারী পক্ষ। পরবর্তীতে সরকার আপিল করলে তা খারিজ হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিভিশন (নং ৩৩৯৬/২০০৮) মঞ্জুর করে উক্ত ডিক্রি বহাল রাখেন। ফলে এই জমিতে যেকোনো ধরনের উচ্ছেদ বা পরিবর্তন আদালতের রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন।
​একাধিক বিচারাধীন দেওয়ানি মামলা:
বর্তমানে উক্ত জমির স্বত্ব ও দখল নিয়ে যুগ্ম জেলা জজ ৩য় আদালতে (মামলা নং ৬৯১/২০১০), সিনিয়র সহকারী জজ ৫ম আদালতে (মামলা নং ৪৪০/২০২১) এবং অর্পিত সম্পত্তি ট্রাইব্যুনালে (মামলা নং ১২২২) মামলা বিচারাধীন। বিচারিক আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা বিচার প্রক্রিয়ায় বাধার শামিল।
​অস্পষ্ট সীমানা ও নামজারির সীমাবদ্ধতা:
আবেদনে .১৮৫০ একর জমির কোনো নির্দিষ্ট চৌহদ্দী বা সীমানা উল্লেখ করা হয়নি। আইন অনুযায়ী, কেবল নামজারি বা জমাভাগ খতিয়ান (খতিয়ান নং ৩২১০ ও ৩২২৯) কোনো ভূমির মূল স্বত্ব বা দখলের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না।

*​বিরোধীয় সম্পত্তির তফসিল:*
• ​জেলা: চট্টগ্রাম
• ​থানা: বায়েজিদ বোস্তামী
• ​মৌজা: জালালাবাদ
• ​খতিয়ান ও দাগ: আর.এস. ৩৪ নম্বর খতিয়ানের আর.এস. ১১১৬/১১১৭ নম্বর দাগের সামিল বি.এস. ১৩৪ নম্বর খতিয়ানের বি.এস. ৮০৫ নম্বর দাগ।
• ​পরিমাণ: .১৮৫০ একর (নাল ভূমি)
​বর্তমান পরিস্থিতি:
​আপত্তিকারী পক্ষ জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনটি অবিলম্বে খারিজ করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দেওয়ানি আদালত ও হাইকোর্টের রায় পর্যালোচনা না করে এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রকার উচ্ছেদ বা স্থানান্তর কার্যক্রম গ্রহণ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

​এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো কিছু জানা যায়নি। সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নথিপত্র, হাইকোর্টের নির্দেশ ও সরেজমিন দখল পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি।