ঢাকা ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩

‘সবজান্তা’ কাজী হাসানের দুর্নীতির ১৬০০ কোটি টাকা পাচার যুক্তরাষ্ট্রে!

​একই সঙ্গে আটটি গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়ন্ত্রক। মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও ‘মামা’ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর ধরে বাগিয়ে রেখেছেন প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের মতো সাংঘর্ষিক চেয়ার। প্রকল্প মানেই ২ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন, আর গত ১৫ বছরে তার বিরুদ্ধে উঠেছে প্রায় ১ হাজার৬০০ কোটি টাকার পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ।

​তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বহুল বিতর্কিত কর্মকর্তা কাজী হাসান বিন শামস। ১৯৯৮ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর থেকেই জড়িয়েছেন একের পর এক কেলেঙ্কারিতে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ৫ মামলা ও ট্রুথ কমিশনের কাছে নিজের মুখে দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা জমা দিয়েও বহাল তবিয়তে আছেন এই ‘স্বঘোষিত’ দুর্নীতিবাজ। সর্বশেষ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং পদোন্নতি পেতে উচ্চ আদালতে দাখিল করেছেন জালিয়াতিপূর্ণ রিট।

​খোদ সিডিএ-র নথিপত্র, মন্ত্রণালয় ও আদালত সূত্রে কাজী হাসান বিন শামসের দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের এক রোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে।

​কাজী হাসান বিন শামসের দুর্নীতির খাতা খোলে ২০০৫ সালে। নগরের বাকলিয়ায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কল্পলোক আবাসিক এলাকা (১ম পর্যায়)’ প্রকল্পের পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব পান তিনি। সেখানেই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তাকে শুনানিতে ডাকলেও অদৃশ্য ইশারায় সেই তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি।

​২০০৮ সালে অক্সিজেন-কুয়াইশ বুড়িশ্চর সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের পিডি থাকাকালীন ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে অবিশ্বাস্য জালিয়াতি করেন কাজী হাসান। ২০০৬ সালে নির্মিত দুটি ক্রস কালভার্টের (লট নং- ১৭ ও ২৫) প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় ছিল যথাক্রমে ২ লাখ ২৪ হাজার ও ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু ভুয়া পরিমাপ বই (এমবি) ও ভুয়া বিল তৈরি করে সিডিএ থেকে উত্তোলন করা হয় যথাক্রমে ৫ লাখ ৯১ হাজার ও ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এভাবে সরকারের ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় কাজী হাসানের বিরুদ্ধে ৫টি মামলা দায়ের করে দুদক।

​দুর্নীতির জাল থেকে বাঁচতে ২০০৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজী হাসান বিন শামস বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখার মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করেন এবং দুঃখ প্রকাশ করে ট্রুথ কমিশন থেকে মার্জনাপত্র নেন। তবে পরবর্তীতে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ ট্রুথ কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করায় তার সেই মার্জনা বাতিল হয়ে যায়। আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলার দায় থেকে তার পার পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এমনকি ২০১২ সালে গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় চার্জশিটভুক্ত আসামি হিসেবে তাকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিলেও সিডিএ-র তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুস সালাম তাকে বুক দিয়ে আগলে রাখেন, কোনো ব্যবস্থাই নেননি।

​লুটপাটের খতিয়ান থাকার পরও ২০১১ সালে কাজী হাসানকে দেওয়া হয় ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্পের দায়িত্ব। ৮৫৬ কোটি টাকার প্রকল্প দফায় দফায় সংশোধন করে খরচ বাড়ানো হয় ৪ গুণ! ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই নির্মাণাধীন পতেঙ্গা আউটার রিং রোডের কয়েকশ ফুট ধসে পড়ে, সরে যায় মূল শহর রক্ষা বাঁধের ব্লক। রড বা বাঁশ ছাড়াই যেনতেন সিসি ঢালাইয়ের কারণে সিডিএ-র কাজের মান নিয়ে তীব্র সমালোচনা ঝড় ওঠে।

​এখানেই শেষ নয়; এই প্রকল্পে নিযুক্ত সিডিএ-র ৭ কর্মকর্তা মূল বেতনের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত পাওয়ার নিয়ম থাকলেও নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে নিয়েছেন ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ। ২০২১ সালে দুদক তাকে রহস্যজনক ‘দায়মুক্তি’ দিলেও, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এই প্রকল্পের দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।

​অভিযোগ রয়েছে, বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড প্রকল্পে সীতাকুণ্ড মৌজায় স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে রিসোর্ট নির্মাণে সরাসরি সহায়তা করেন কাজী হাসান। বিনিময়ে ওই এলাকায় নিজের নামেও বিশাল জায়গা কেনেন তিনি। সিডিএ-র বড় বড় টেন্ডার পাইয়ে দিতে তাকে ব্যাকআপ দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক।

​বিগত ১৫ বছরে প্রকল্প কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে কাজী হাসান প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। যার বড় একটি অংশ পাচার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। তার বড় মেয়ে নিউইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন এবং মেয়ের নামেই নিউইয়র্ক স্টেটে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

​বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজের মামা (দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোসলেম উদ্দিন) এবং সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদকে ব্যবহার করে সিডিএ-র পুরো নিয়ন্ত্রণ নেন কাজী হাসান। নির্বাহী প্রকৌশলী হয়েও তিনি একাধারে ধরেন ৮টি পদ:
১. নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল পদ)
২. বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)
৩. তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-১ (চলতি দায়িত্ব)
৪. ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী
৫. ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ
৬. নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য সচিব (পদাধিকার বলে)
৭. বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন কমিটির চেয়ারম্যান (পদাধিকার বলে)
৮. ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান (পদাধিকার বলে)
​একই ব্যক্তি নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন এবং নিজেই আবার প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে সেটার তদারকি করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

​চলতি বছরের মে মাসে দুদকের মামলা সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় কাজী হাসানের বিপক্ষে গেলেও তিনি দমে যাননি। ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর মামলা থেকে ‘অব্যাহতি’ পাওয়ার ভুয়া ধোঁয়াশা তুলে প্রধান প্রকৌশলী পদের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। regular promotion পেতে উচ্চ আদালতে রিট করেন। কিন্তু সেখানেও জমা দেন জাল নথিপত্র!

​আদালতে তিনি সিডিএ চেয়ারম্যান বরাবর করা দুটি আবেদনপত্র (২০১৯ ও ২০২৫ সালের) সংযুক্ত করেন, যেখানে দুই আবেদনেই তিনি ২১ বছর কর্মরত আছেন বলে দাবি করেন। অর্থাৎ ৬ বছরের ব্যবধানেও তার কর্মজীবনের হিসাব অপরিবর্তিত! সিডিএ নথিপত্র ঘেঁটে জানিয়েছে, ওই আবেদনপত্রগুলোর রিসিভ কপি ভুয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরের সাথে মেলার কোনো সুযোগ নেই।

​তাছাড়া, চউকের চাকরি প্রবিধানমালা ১৯৯০ অনুযায়ী, প্রধান প্রকৌশলী হতে হলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কাজী হাসানের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ায় তার সেই যোগ্যতাই নেই। গত ১৬ বছরে নিজের চেয়ার ধরে রাখতে তিনি রেকর্ড ৪৪টি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন।

​গত বছরের ১১ ডিসেম্বর সিডিএ-র ২০ হাজার ৭১৬ কোটি টাকার ১৩টি মেগা প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে ৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং ‘এ্যাব’ মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর হাছিন আহমেদের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে শেষ মুহূর্তে এসে সেই তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে সক্ষম হন কাজী হাসান বিন শামস।

​আত্মস্বীকৃত এই দুর্নীতিবাজের খুঁটির জোর কোথায় এবং একের পর এক জালিয়াতির পরও কেন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে এখন চট্টগ্রামের সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

চৌমুহনীতে ডিবির অভিযানে ১৪ তরুণ-তরুণী আটক

‘সবজান্তা’ কাজী হাসানের দুর্নীতির ১৬০০ কোটি টাকা পাচার যুক্তরাষ্ট্রে!

আপডেট সময় : ০৭:২৭:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

​একই সঙ্গে আটটি গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়ন্ত্রক। মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও ‘মামা’ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর ধরে বাগিয়ে রেখেছেন প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের মতো সাংঘর্ষিক চেয়ার। প্রকল্প মানেই ২ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন, আর গত ১৫ বছরে তার বিরুদ্ধে উঠেছে প্রায় ১ হাজার৬০০ কোটি টাকার পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ।

​তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বহুল বিতর্কিত কর্মকর্তা কাজী হাসান বিন শামস। ১৯৯৮ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর থেকেই জড়িয়েছেন একের পর এক কেলেঙ্কারিতে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ৫ মামলা ও ট্রুথ কমিশনের কাছে নিজের মুখে দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা জমা দিয়েও বহাল তবিয়তে আছেন এই ‘স্বঘোষিত’ দুর্নীতিবাজ। সর্বশেষ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং পদোন্নতি পেতে উচ্চ আদালতে দাখিল করেছেন জালিয়াতিপূর্ণ রিট।

​খোদ সিডিএ-র নথিপত্র, মন্ত্রণালয় ও আদালত সূত্রে কাজী হাসান বিন শামসের দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের এক রোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে।

​কাজী হাসান বিন শামসের দুর্নীতির খাতা খোলে ২০০৫ সালে। নগরের বাকলিয়ায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কল্পলোক আবাসিক এলাকা (১ম পর্যায়)’ প্রকল্পের পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব পান তিনি। সেখানেই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তাকে শুনানিতে ডাকলেও অদৃশ্য ইশারায় সেই তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি।

​২০০৮ সালে অক্সিজেন-কুয়াইশ বুড়িশ্চর সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের পিডি থাকাকালীন ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে অবিশ্বাস্য জালিয়াতি করেন কাজী হাসান। ২০০৬ সালে নির্মিত দুটি ক্রস কালভার্টের (লট নং- ১৭ ও ২৫) প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় ছিল যথাক্রমে ২ লাখ ২৪ হাজার ও ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু ভুয়া পরিমাপ বই (এমবি) ও ভুয়া বিল তৈরি করে সিডিএ থেকে উত্তোলন করা হয় যথাক্রমে ৫ লাখ ৯১ হাজার ও ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এভাবে সরকারের ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় কাজী হাসানের বিরুদ্ধে ৫টি মামলা দায়ের করে দুদক।

​দুর্নীতির জাল থেকে বাঁচতে ২০০৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজী হাসান বিন শামস বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখার মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করেন এবং দুঃখ প্রকাশ করে ট্রুথ কমিশন থেকে মার্জনাপত্র নেন। তবে পরবর্তীতে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ ট্রুথ কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করায় তার সেই মার্জনা বাতিল হয়ে যায়। আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলার দায় থেকে তার পার পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এমনকি ২০১২ সালে গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় চার্জশিটভুক্ত আসামি হিসেবে তাকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিলেও সিডিএ-র তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুস সালাম তাকে বুক দিয়ে আগলে রাখেন, কোনো ব্যবস্থাই নেননি।

​লুটপাটের খতিয়ান থাকার পরও ২০১১ সালে কাজী হাসানকে দেওয়া হয় ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড’ প্রকল্পের দায়িত্ব। ৮৫৬ কোটি টাকার প্রকল্প দফায় দফায় সংশোধন করে খরচ বাড়ানো হয় ৪ গুণ! ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই নির্মাণাধীন পতেঙ্গা আউটার রিং রোডের কয়েকশ ফুট ধসে পড়ে, সরে যায় মূল শহর রক্ষা বাঁধের ব্লক। রড বা বাঁশ ছাড়াই যেনতেন সিসি ঢালাইয়ের কারণে সিডিএ-র কাজের মান নিয়ে তীব্র সমালোচনা ঝড় ওঠে।

​এখানেই শেষ নয়; এই প্রকল্পে নিযুক্ত সিডিএ-র ৭ কর্মকর্তা মূল বেতনের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত পাওয়ার নিয়ম থাকলেও নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে নিয়েছেন ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ। ২০২১ সালে দুদক তাকে রহস্যজনক ‘দায়মুক্তি’ দিলেও, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এই প্রকল্পের দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।

​অভিযোগ রয়েছে, বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড প্রকল্পে সীতাকুণ্ড মৌজায় স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে রিসোর্ট নির্মাণে সরাসরি সহায়তা করেন কাজী হাসান। বিনিময়ে ওই এলাকায় নিজের নামেও বিশাল জায়গা কেনেন তিনি। সিডিএ-র বড় বড় টেন্ডার পাইয়ে দিতে তাকে ব্যাকআপ দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক।

​বিগত ১৫ বছরে প্রকল্প কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে কাজী হাসান প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। যার বড় একটি অংশ পাচার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। তার বড় মেয়ে নিউইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন এবং মেয়ের নামেই নিউইয়র্ক স্টেটে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

​বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজের মামা (দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোসলেম উদ্দিন) এবং সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদকে ব্যবহার করে সিডিএ-র পুরো নিয়ন্ত্রণ নেন কাজী হাসান। নির্বাহী প্রকৌশলী হয়েও তিনি একাধারে ধরেন ৮টি পদ:
১. নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল পদ)
২. বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)
৩. তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-১ (চলতি দায়িত্ব)
৪. ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী
৫. ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ
৬. নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য সচিব (পদাধিকার বলে)
৭. বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন কমিটির চেয়ারম্যান (পদাধিকার বলে)
৮. ইমারত নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান (পদাধিকার বলে)
​একই ব্যক্তি নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন এবং নিজেই আবার প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে সেটার তদারকি করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

​চলতি বছরের মে মাসে দুদকের মামলা সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় কাজী হাসানের বিপক্ষে গেলেও তিনি দমে যাননি। ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর মামলা থেকে ‘অব্যাহতি’ পাওয়ার ভুয়া ধোঁয়াশা তুলে প্রধান প্রকৌশলী পদের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। regular promotion পেতে উচ্চ আদালতে রিট করেন। কিন্তু সেখানেও জমা দেন জাল নথিপত্র!

​আদালতে তিনি সিডিএ চেয়ারম্যান বরাবর করা দুটি আবেদনপত্র (২০১৯ ও ২০২৫ সালের) সংযুক্ত করেন, যেখানে দুই আবেদনেই তিনি ২১ বছর কর্মরত আছেন বলে দাবি করেন। অর্থাৎ ৬ বছরের ব্যবধানেও তার কর্মজীবনের হিসাব অপরিবর্তিত! সিডিএ নথিপত্র ঘেঁটে জানিয়েছে, ওই আবেদনপত্রগুলোর রিসিভ কপি ভুয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরের সাথে মেলার কোনো সুযোগ নেই।

​তাছাড়া, চউকের চাকরি প্রবিধানমালা ১৯৯০ অনুযায়ী, প্রধান প্রকৌশলী হতে হলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কাজী হাসানের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ায় তার সেই যোগ্যতাই নেই। গত ১৬ বছরে নিজের চেয়ার ধরে রাখতে তিনি রেকর্ড ৪৪টি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন।

​গত বছরের ১১ ডিসেম্বর সিডিএ-র ২০ হাজার ৭১৬ কোটি টাকার ১৩টি মেগা প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে ৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং ‘এ্যাব’ মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর হাছিন আহমেদের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে শেষ মুহূর্তে এসে সেই তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে সক্ষম হন কাজী হাসান বিন শামস।

​আত্মস্বীকৃত এই দুর্নীতিবাজের খুঁটির জোর কোথায় এবং একের পর এক জালিয়াতির পরও কেন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে এখন চট্টগ্রামের সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।